জাগ্রত নাগরিক সমাজ ও আন্না হাজারে

অধ্যাপক অরুণাভ বন্দ্যোপাধ্যায়

সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা পূর্ব ইউরোপের সমাজতন্ত্রবাদের পতনের পর রাজনীতি ও সমাজতত্বের আলোচনায় নাগরিক সমাজের ধারণাটি বিশেষ অর্থবহ হয়ে উঠেছে। প্রখ্যাত ইতালিয় মার্ক্সবাদী তাত্বিক আন্তেনিও গ্রামশির ভবিষ্যৎবাণী নির্ভুল বলে প্রমানিত হয়েছে এবং এটা অনুভূত হয়েছে যে কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থাই শুধুমাত্র স্থূলশক্তি বা পশুশক্তি প্রয়োগ করে তার শাসন কে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারেনা। দমনমূলক যন্ত্রের পাশাপাশি শাসকশ্রেণিকে জনগনের উপর বৌদ্ধিক আধিপত্য বিস্তার করতে হয় বা নাগরিক সমাজকে প্রভাবিত করতে হয়। নাগরিক সমাজকে সন্তুষ্ট করতে না পারলে দীর্ঘস্থায়ী শাসনের উন্নত ভোটিং মেশিনারিও যে প্রচলিত ব্যবস্থাকে অটুট রাখতে পারেনা, পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদল তা প্রমাণ করেছে।

অবশ্য নাগরিক সমাজ বলতে কিছু ছবি আঁকিয়ে, সিরিয়ালের অভিনেত্রী বা টিভিতে মুখ দেখানো বুদ্ধিজীবির সম্মীলনকে বোঝায় না, নাগরিক সমাজ এরূপ সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক ধারণা নয়। আর ধারণাটি আজকেরও নয়, প্রায় আড়াইশো বছরের পুরোনো। অষ্টাদশ শতকে রেনেসাঁসের যুগে পশ্চিম ইউরোপে ধারণাটির উদ্ভব ঘটে। মার্ক্সীয় ও অ-মার্ক্সীয় তাত্বিকবর্গ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ধারণাটিকে ব্যাখ্যা করার ফলে এর কোনো সর্বজন সম্মত রূপ গড়ে ওঠেনি। সকল উদারবাদী তাত্বিকও ধারণাটি সম্বন্ধে সহমত নন। যেমন লকের পুরসমাজ হেগেলের পুর সমাজ থেকে স্বতন্ত্র। বর্তমানে বিশ্বায়নের রাজনীতিও পৃথক আঙ্গিকে ‘নাগরিক সমাজ’-এর ব্যাখ্যা দিচ্ছে।

সবদিক বিবেচনা করে বলা যায় এই ধারণাটির মূলে রয়েছে মুক্ত বা স্বাধীন ব্যাক্তির স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় কর্মোদ্যোগের অস্তিত্ব। এটি একাধারে রাজনৈতিক ও সামাজিক মুর্ছনা সম্পৃক্ত। সামাজিক দিক থেকে এ হল – রাষ্ট্র ও পরিবারের মধ্যে অবস্থিত ব্যাক্তির এমন এক স্বতঃস্ফূর্ত মেলামেশার জায়গা যা পরিবার ও রাষ্ট্রের থেকে স্বাতন্ত্র্য ভোগ করে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দিক থেকে নাগরিক সমাজ হল স্বাধীন মানুষের স্বাভাবিক আনুগত্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এমন এক পরিসর যা পোলিটিক্যাল ইস্যুর ভিত্তিতে রাষ্ট্রের সঙ্গে দর কষাকষি করতে সক্ষম। পশ্চিমের উন্নত ও আধুনিক সমাজে বহুদিন আগেই সক্রিয় নাগরিক সমাজের উদ্ভব ঘটেছে। ফলে সেখানে সরকারকে অনেক সচেতন ভাবে নীতি-নির্ধারন করতে হয় বা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। অন্যদিকে ভারতীয় সমাজে দারিদ্র, অশিক্ষা, ধর্মীয় বাতাবরণ, রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব প্রভৃতি কারণে নাগরিক সমাজের অস্তর্থক ভুমিকা এতদিন পর্যন্ত অনুভুত হয়নি। যা এবারে ঘটল। গান্ধি টুপি পরিহিত চুয়াত্তর বছরের এক বৃ্দ্ধের নেতৃ্ত্বে ঐতিহাসিক ১৬-২৭ আগষ্ট, ২০১১ যে জনশক্তির ব্যাপক উদ্বোধন ঘটল, বিশ্ব ইতিহাসে তার নজির বেশি নেই। সংবিধানের ধারক ও বাহক নেতা মন্ত্রীরা বুঝে গেছে দুর্নীতি দমনের জন্য সরকারকে লোকপাল বিল পাশ করাতে বাধ্য করানো একটি উপলক্ষ্য মাত্র, ঘটনাটির প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এই ঘটনা আরও প্রমান করল যে, ভবিষ্যতে নীতি-নির্ধারনের ক্ষেত্রে সরকারকে অনেক বেশি সচেতন হতে হবে এবং নাগরিক সমাজকে উপেক্ষা করা আর বোধহয় সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। আর আমরা দেশবাসীরা, নতুন প্ল্যাটফর্ম পেলাম- সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি করার। রাজনৈতিক পক্ষপাত দুষ্ট ব্যাক্তিবর্গ যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, এর ফলে সংসদীয় ব্যবস্থার পবিত্রতা নষ্ট হবে, সরকার ক্ষমতাহীন এবং নাগরিক সমাজের ক্রীড়নকে পরিণত হবে। আমি বলব এতে ক্ষতি কি? বরং এটা হল ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়ম। সরকারের বিভাগগুলি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, জনগণের প্রয়োজন পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন উপযুক্ত ইস্যু আর নেতৃত্ব পেলেই জনশক্তির জাগরণ ঘটবেই ঘটবে। যাদের ট্যাক্সের টাকায় সরকার চলে তারা সরকারি খরচের হিসেব চাইবেনা? নেতা যাদের ভোট পেয়ে মন্ত্রী হলেন তারা নেতার নৈতিক অধঃপতনের বিচার না করলে কে করবে? অনেকে আন্নার আন্দোলনের পন্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আমি বলব এর থেকে ভালো পথ আর কী হতে পারে? গান্ধিজীকে আমরা জাতির জনক বলে মানি। তার অহিংসার আদর্শ আজও যে কত শক্তিশালী আন্না তা নতুন ভাবে প্রমান করলেন। ব্যাক্তি আন্না কে নিয়ে নিশ্চয় কোনো সংশয় থাকতে পারেনা। যে ব্যাক্তি শৈশবে দারিদ্রের সাথে লড়াই করেছেন, তারুন্য কেটেছে সীমান্তে দেশরক্ষায়, বাকি জীবনটা নিযুক্ত করেছেন প্রান্তিক গ্রামগুলির মানুষদের উন্নয়নের কাজে- তাদের প্রানের আন্না হয়ে, সেই মানুষটার দেশপ্রেম নিয়ে, মানবপ্রেম নিয়ে নিশ্চয় প্রশ্ন থাকতে পারেনা। সুতরাং সমালোচনা নয়, নতুন এই প্রবনতা কে আমরা স্বাগত জানাই। সচেতন নাগরিক সমাজ কখনোই রাষ্ট্রের অস্তিত্বের পক্ষে বাধা নয়, বরং তা সুস্থতার পরিচায়ক। সংবিধান ও সংসদীয় ব্যবস্থার পবিত্রতা রক্ষা করতে নেতা মন্ত্রীরা ব্যর্থ হলে নাগরিক সমাজকেই তো তার দায়িত্ব নিতে হবে।

If you found this article interesting, please copy the code below to your website.
x 
Share

9 Responses to “জাগ্রত নাগরিক সমাজ ও আন্না হাজারে”

  1. biplab das 7 September 2011 at 8:39 PM #

    DARUN LEKHA

  2. Anabil 7 September 2011 at 9:26 PM #

    Daarun…..

  3. নীল ধ্রুবতারা 7 September 2011 at 10:14 PM #

    “যে ব্যাক্তি শৈশবে দারিদ্রের সাথে লড়াই করেছেন, তারুন্য কেটেছে সীমান্তে দেশরক্ষায়, বাকি জীবনটা নিযুক্ত করেছেন প্রান্তিক গ্রামগুলির মানুষদের উন্নয়নের কাজে- তাদের প্রানের আন্না হয়ে, সেই মানুষটার দেশপ্রেম নিয়ে, মানবপ্রেম নিয়ে নিশ্চয় প্রশ্ন থাকতে পারেনা।”–একদম ঠিক কথা তার সমালোচনা না করে তার সহযোদ্ধা হয়ে অঠাতাই আমাদের কাম্য।তবুওতো সমালোচকের অভাব নেই।

    সুতরাং সমালোচনা নয়, নতুন এই প্রবনতা কে আমরা স্বাগত জানাই। সচেতন নাগরিক সমাজ কখনোই রাষ্ট্রের অস্তিত্বের পক্ষে বাধা নয়, বরং তা সুস্থতার পরিচায়ক।—— খুব সুন্দর ও তথ্য বহুল লেখা।ভালো লাগলো।

  4. suman 8 September 2011 at 11:17 PM #

    valo.

  5. KAUSIK SARKAR 9 September 2011 at 1:51 PM #

    Nice sharing.

  6. Bipu 9 September 2011 at 4:20 PM #

    thanks prof. for this article

  7. sujoy chanda 10 September 2011 at 7:11 PM #

    outstanding||||!

  8. Dwijapada Bouri 13 September 2011 at 10:42 AM #

    Darun lekha, Dhanyobad Prof. Bandyopadhyay

  9. hegaboga 24 October 2011 at 8:13 AM #

    এপার বাংলায় বসে যেভাবে হাজারীর মহৎ উদ্যোগ ও এর প্রয়োগ দেখলাম তাতে করে দূর্নীতির বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ে লড়াইএর অহিংসা পন্থার উপযোগীতায় মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না। নিজে বৌদ্ধ হওয়ায় অহিংস নীতিকে একটু বেশী কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল, কিন্তু জন্মভুমি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সরকারের নিপীড়ন আর হিংসার বিষ বাস্পে পিস্ট হতে হতে এবং দালাই লামার তিব্বতের চেহারা দেখে এর উপযোগিতা বিষয়ে সন্দেহের মাত্রাটা দিন দিন গাঢ় হচ্ছিল ঠিক সেই সময় আন্না যেন পড়ন্ত বেলাকে মধ্যগগনে নিয়ে আসলেন!আন্না হাজারী, সেলুট তোমাকে !


Leave a Reply