ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির বার্ষিক সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য – ২০১৭

সাধারণ সম্পাদক মণীশ রায়চৌধুরির বক্তব্য
১৯-০৩-২০১৭

‘ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি’-র বার্ষিক সম্মেলন ২০১৭-য় যোগদান করার জন্য সকল সহযোদ্ধাদের জানাই সংগ্রামী অভিনন্দন।
১ মার্চ, ১৯৮৫ সমাজ পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে দমদমের একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে জন্ম নেয় ‘ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি’। বাকিটা ইতিহাস। জন্মলগ্ন থেকেই যেসকল অসম যুদ্ধে জয় এসেছে তাআপনাদের জানা।
বেশ চলছিল, বহু মুক্তমনা মানুষ (অন্তত সেই সময়ে তাই মনে হয়েছিল) প্রবীর ঘোষের যুক্তিবাদী সমিতির সাথে যুক্ত হলেন।
বিভিন্ন জ্যোতিষী ও তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতাধরদের ভান্ডাফোঁড় করলেই তা সংবাদপত্রে তা গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হত।
তাই প্রবীর ঘোষের কাছাকাছি থাকতে পারলে ‘প্রগতিশীল’ তকমা পাওয়া যাবে, যার প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে চড়া লাভের সম্ভাবনা ছিল।
কিন্তু ‘ধর্ম-সেবা-সম্মোহন’ এবং ‘সংস্কৃতি: সংঘর্ষ ও নির্মাণ’ বই দুটি প্রকাশিত হতেই অনেকের হিসেবে গোলমাল হয়ে গেল।
‘ধর্ম-সেবা-সম্মোহন’-এ প্রবীর ঘোষ ‘সেবা’র ব্যবসার আড়ালে ফান্ডেড এনজিও গড়ে তোলার প্রতিবাদ করলেন।
তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন সেবা দ্বারা কোনদিন সমাজ পরিবর্তন করা যায়না।
কারণ ভিখারি কোনদিন বিপ্লবী হতে পারেনা। অপর বইটি তো আরও মারাত্মক।
‘যুক্তিবাদ’-ই কেন একমাত্র সামগ্রিক দর্শন তা এর আগে কোনও বাম বুদ্ধিজীবীও এত প্রাঞ্জলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি।
বইটিতে উঠে এলো ভারতের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষণ।
‘দেশপ্রেম’, ‘দেশদ্রোহ’, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ থেকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ প্রতিটা বহুল প্রচলিত শব্দের সাথেই তিনি আমাদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
এই দুটি বইতেই তিনি ‘যুক্তিবাদী সমিতি’র রূপরেখা স্পষ্ট করে দিলেন। তিনি বুঝিয়ে দিলেন এই সংগঠন স্বাধীন নেকড়ে হওয়ার জন্যই জন্মেছে।
রাষ্ট্রীয় দালালরা কোনভাবেই একে গলায় চেন বাঁধা পোষা ফান্ডেড এনজিও বানাতে পারবেনা।
রাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই অশনিসংকেত দেখতে পেল।
ফলস্বরূপ ১৯৯৬ তে লেখকের চরিত্রহননের নোংরা খেলা শুরু হল যা আজও থামেনি। এমনকি ‘আমি কেন ঈশ্বরে বিশ্বাস করিনা’ নামক বেস্টসেলার বইতে যাদের তিনি ‘ভাই’ বলে উল্লেখ করেছিলেনতারা আজও কালি ছেটানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছে।
প্রকৃতপক্ষে, যুক্তিবাদী সমিতি যদি অলৌকিকের রহস্যভেদের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখত তাহলে এদের কোন সমস্যা হতনা।
ভারতে এমন অনেক বিজ্ঞান সংগঠনই আছে যারা শুধুমাত্র এই কাজ করার জন্যই এনজিও খুলে বসেছেন।
যুক্তিবাদের প্রসারে এদের ভূমিকা নগণ্য। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়ার প্রচারে এরা বিরাট।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ক্ষেত্রে কিন্তু চিত্রটা সম্পূর্ণ বিপরীত। সেই জন্যই পৃথিবীখ্যাত বই 50 Voices of Disbelief-এ ভারত থেকে মাত্র দুজন লেখার আমন্ত্রণ পান।
এই দুজন হলেন যুক্তিবাদী সমিতির প্রবীর ঘোষ এবং সুমিত্রা পদ্মনাভন।
আমার খুবই মজা লাগে যখন দেখি সেন্টহুড ইস্যুতে ২১টি বিদেশী মিডিয়া বাড়ি এসে প্রবীর ঘোষের ইন্টার্ভিউ নিয়ে যায় অথচ বাংলার মিডিয়া তার খবর চাপতে ব্যস্ত থাকে।
আবার মূল বক্তব্যে ফেরা যাক। অনেকেই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে আমাকে বলেছেন যে প্রবীর ঘোষের ‘অলৌকিক নয় লৌকিক’ এবং ‘আমি কেন ঈশ্বরে বিশ্বাস করিনা’ তাদের যুক্তিবাদীকরে তুলেছে।
কথাটা সত্য, কিন্তু সম্পূর্ণ নয়।
কারণ যুক্তিবাদ কক্ষনোই নাস্তিকতায় সীমাবদ্ধ নয়।
আজকের দুনিয়ায়, সারাদিন ঈশ্বরে আছেন না নেই এই জাতীয় তত্বকথার বুদ্ধিজীবী তকমা পাওয়া ছাড়া খুব বেশি কিছু হয়না।
সেইজন্যেই প্রবীর ঘোষের বই শুধু ধর্ম বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়। তার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাম্যবাদী রাজনীতি।
প্রত্যেক সমনস্ক বন্ধুদের অনুরোধ করব যদি আপনারা প্রকৃতপক্ষে যুক্তিবাদী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান তাহলে ‘সংস্কৃতি-সংঘর্ষ ও নির্মাণ’ পড়ুন।
যদি আগেই পড়ে থাকেন তাহলে আবার পড়ুন।
নাহলে আন্দোলনকে ধ্বংস করতে রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের দরকার হবে না, আপনারাই যথেষ্ট।

annual-conference-of-bhartiya-bigyan-o-juktibadi-samiti-humanists-association-2017-7

If you found this article interesting, please copy the code below to your website.
x 
Share

One Response to “ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির বার্ষিক সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য – ২০১৭”

  1. soma sengupta 28 March 2017 at 12:21 PM #

    গত দু বছর সম্মেলনে যেতে পারি নি . খুব miss করি.


Leave a Reply