‘স্বাধীনতা’ অর্জন, নাকি দান গ্রহণ?

প্রবীর ঘোষ

সভাপতি, ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি

                                 ইংরেজরা ‘ভারতবর্ষ’ নামের দেশটা শাসন করতো আটষট্টি বছর আগেও। শুধু শাসনের গুরু দায়িত্ব কে বয়, শোষণের মজা ও রস না পেলে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইংরেজদের রমরমা বাজার। পৃথিবী জুড়ে কলোনি গড়ে তুলেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য তাই অস্ত যেত না। কলোনিগুলো শাসন করার দায়িত্বে ছিল ইংলন্ডের লালমুখো সাহেব ছাড়া সিভিল সার্ভেন্ট আমলারা।

          দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রচণ্ড মার খেয়ে কোমর ভাঙলো ব্রিটিশ শক্তির। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ সিংহের ‘হালুম’ বেড়ালের ‘মিউ’-তে এসে দাঁড়ালো। সামরিক শক্তি ও অর্থনীতি ভেঙ্গে খান্‌ খান্‌। যুদ্ধ পরবর্তী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলি হাউজ অফ কমন্সে বললেন, “এই আর্থিক সঙ্কটের কারণে আমাদের আমদানি ছাঁটাই করতে হবে। যাত্রী বিমান চলাচল বন্ধ করতে হবে। বিদেশে যাওয়ার পাউন্ড খরচ করা যাবে না। সৈন্য ছাঁটাই করতে হবে। কলোনিগুলো শাসন করার খরচ বহন করতে হলে দেশ আবার আর্থিক সঙ্কটে পড়বে।”

          ব্রিটেন এ-হেন দৈন্য দশা থেকে বাঁচতে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভিক্ষের ঝুলি পাতলো। বেনিয়া আমেরিকা শুধু শুধু ভিক্ষে দিয়ে ইংরেজদের দুর্দশা ঘোচাতে যে রাজি নয়, তা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল। স্যার উইলফ্রিড ইয়াডির নেতৃত্বে ব্রিটিশ প্রতিনিধি দল দৌড়লো ওয়াশিংটনে। ওয়াশিংটনে জরুরি বৈঠক বসলো টানা দু-দিন। আমেরিকা সাফ জানালো- ব্রিটিশরা কিভাবে ঋণের ডলার খরচ করবে, অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আস্তে কী পরিকল্পনা নিচ্ছে, তার পুরো বিবরণ পেশ করতে হবে। ছাড়তে হবে কলোনি দখল রাখার মাথাভারী বিলাসিতা। শাসন ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে বিশ্বস্ত কলোনিবাসীর হাতে, যাতে অর্থনৈতিক শোষণের রাস্তাটা খোলা থাকে। অর্থনৈতিক শোষণ কর্তৃত্ব ব্রিটিশ শক্তির একচেটিয়া থাকবে না। সিংহভাগ ছেড়ে দিতে হবে মার্কিনীদের হাতে।

          ব্রিটিশ শক্তি এত বড় ঐতিহাসিক সঙ্কটে পড়েছিল যে, মার্কিনী প্রস্তাবগুলোতে রাজি না হয়ে পারেনি। দেশের দুর্দিন কাটাতে আকাশের মত উদার হওয়ার ভান করে কলোনিগুলোর স্বাধীনতা দান করতে লাগলো।

          ভগৎ সিং থেকে ক্ষুদিরাম, নৌ-বিদ্রোহ থেকে চুয়ার বিদ্রোহ এবং বহু মানুষের রক্ত ঝরানো ইতিহাসকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তারপরও সত্যের খাতিরে বলতেই হচ্ছে- ব্রিটিশ শক্তি আজ থেকে আটষট্টি বছর আগে দিল্লিতে কংগ্রেস ও করাচীতে মুসলিম লিগকে গদিতে বসিয়েছিল তাদের পরিকল্পনার অঙ্গ হিসেবে। আন্দোলনের অনিবার্য পরিণতিতে নয়।

          পশ্চিম এশিয়ার জর্ডন ভারতের ‘স্বাধীনতা’র বছর খানেক আগে স্বাধীন হয়েছে (২৫ মে, ১৯৪৬)। সে দেশে গান্ধি, সুভাষ,জওহর, প্যাটেল, ভগৎ, ক্ষুদিরাম ছিলেন না। তবু ভারতের আগে সে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে ব্রিটিশ শক্তি। জর্ডনের শাসন ক্ষমতা হাত বদল হয়েছে। ব্রিটিশ শক্তি থেকে ক্ষমতা এসেছে জর্ডনের রাজা আমির আবদুল্লহ-র হাতে।

          জর্ডনের নামটি তুলে এনেছি নিছকই উদাহরণ হিসেবে। বহুর মধ্য থেকে একটি উদাহরণ হিসেবে। মালয়েশিয়া থেকে উগান্ডা, সব দেশের স্বাধীনতার একই ইতিহাস। পরিকল্পনা মত ক্ষমতার হাত বদল করেছে ব্রিটিশ সরকার। বহু ব্রিটিশ কলোনিতেই ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছিল, বিদ্রোহ ছিল। কিন্তু ব্রিটিশরা কলোনিগুলোতে কেন স্বাধীনতা দান করছে- তা ক্ষমতা হাতে পাওয়া কলোনিগুলোর নতুন শাসকদের কারুরই অজানা ছিল না। তবে ক্ষমতার গদিতে বসা নেতারা আমজনতার কাছে প্রচার করতে ব্যগ্র ছিল- তাদের আন্দোলনেই ইংরেজ শাসন উৎখাত হল।

          ক্যারিয়ারিজম-এর এও এক ক্যারিশমা।

If you found this article interesting, please copy the code below to your website.
x 
Share

7 Responses to “‘স্বাধীনতা’ অর্জন, নাকি দান গ্রহণ?”

  1. biplab das 14 August 2015 at 7:26 PM #

    Ekebare thik.

  2. KAUSIK SARKAR 15 August 2015 at 11:29 AM #

    osadharon…………………..
    Congratulation for the same.

  3. soumen 16 August 2015 at 1:15 PM #

    Absolutely true

  4. Dwijapada Bouri 17 August 2015 at 10:08 AM #

    good post……..

  5. Madhusudan Mahato 17 August 2015 at 1:46 PM #

    Good post.

  6. Manish 29 August 2015 at 11:09 PM #

    Darun post.

  7. Bakri 10 November 2015 at 12:17 AM #

    Thanks for shianrg. Always good to find a real expert.


Leave a Reply