গল্প হলেও সত্যি

মনীশ রায়চৌধুরী

গ্রীষ্মের দুপুর। নির্জন চারিদিক।
চিলেকোঠার ঘরে বসে দূরে বাচ্চাদের ঘুড়ি ওড়ানো দেখতে দেখতে বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিলাম।
শোরগোল শুনে তাকিয়ে নিজেই অবাক হয়ে গেলাম।
একি, আমি আদালতে কিভাবে এলাম?

আদালতে তখন তুমুল ব্যস্ততা।
চারপাশে গেরুয়া পোশাক পরা ত্রিশূলধারী সেপাই গিজগিজ করছে।
একজন সৌম্যদর্শন ভয়ানক দেশদ্রোহীর বিচার চলছে।
দশাসই চেহারার গেরুয়া পোশাক পরা বিচারক বসে আছেন।
দেওয়ালে অশোকস্তম্ভের বদলে গোমাতার ছবি লাগান।
তার নিচে আবার ‘সত্যমেব জয়তে’ এর পরিবর্তে কে যেন সংস্কৃতে লিখে দিয়েছে ‘জয় শ্রীরাম’।

এক উকিল ত্রিশুল উঁচিয়ে বলল, “ধর্মাবতার এর দাড়ি আর আলখাল্লা দেখেই বুঝতে পারছেন বুড়োটা পাকিস্তানের চর। ব্যাটা ভারতমাতার বন্দনা করেনা।”
বৃদ্ধ বললেন, “আমি তো সেই কবেই বলেছি দেশ মাটি নয় মানুষে তৈরি। মানুষ অসুখী হলে বন্দেমাতরমের কাব্যকথায় দেশের লজ্জা ঘুচবেনা।” বিচারক বলল, “দেশ মা, তার আরাধনা করতে হয় জাননা?”
“মহাশয়, আমার মতে দেশকে দেশ মনে করেই মানুষের জন্যে কাজ করা উচিত। সেটা যারা পারেনা তাদেরই দেশকে দেবী ভেবে চিৎকার করে ‘মা’ বলে ডেকে আরাধনা করতে হয়। তাতে আবেগ যত থাকে সত্য তত থাকেনা।”
উকিলবাবু এতক্ষণ নিজের টিকিতে হাত বোলাচ্ছিলেন। কথা শেষ হতেই উত্তেজিত স্বরে বললেন, “ধর্মাবতার নিজের কানেই শুনুন এই দেশদ্রোহীর কথা। আমরা ভারতে যে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চাই এই মানুষটা তাতে অন্যতম অন্তরায়।”

বিচারক হাতের কমন্ডুলু থেকে এক ঢোঁক জল খেয়ে প্রশ্ন করল, “আপনি ধর্মরাজ্যে বাধা দিতে চান কেন? আপনি কি ধর্ম মানেননা? আপনি কি প্রভু শ্রীরামকে বিশ্বাস করেননা?”
আসামী বললেন, “মানুষের একটাই ধর্ম মানবধর্ম। সে ধর্ম আমি সারাজীবন পালন করে এসেছি। কিন্তু যেখানে মানুষকে বঞ্চিত করে বিগ্রহ প্রধান হয়ে উঠেছে সেখানেই তা নাগপাশ হয়ে উঠেছে। তা আমি কোনদিন মানিনি, মানবোনা।”
“স্পষ্ট ভাষায় জবাব দিন, আপনি কি প্রভু শ্রীরামকে বিশ্বাস করেননা?”
“মহাশয়, আমার ধর্মের ইতিহাস বিষয়ক প্রবন্ধে বহুকাল আগেই লিখেছিলাম পুরাকালে মানুষ নিজেদের কোন কোন জীবের অংশজাত মনে করত। একে বলে টোটেম বিশ্বাস। রামচন্দ্রের হনুমান, জাম্বুবানরাও সেই ভাবেই নিজেদের বাঁদর, ভাল্লুক ইত্যাদি মনে করত।”

উকিল নিজের রুদ্রাক্ষের মালা আসামীর দিকে ছুঁড়ে মেরে বলল, “ধর্মাবতার এর ধৃষ্টতা দেখুন। আপনার সাথেই তর্ক করছে। আমার জুনিয়র এখনি আমাকে বলল এই লোকটা লিখেছে যে, মোষেও দুধ দেয়। অথচ আমরা বলি দিয়ে তার কাটা মাথা ঘাড়ে করে নাচি। তাই শুধুমাত্র ধর্মের কারণে গরু হত্যা না করা কুসংস্কার মাত্র।”
বিচারক ক্রুদ্ধস্বরে বললেন, “আপনার বয়সের কারণে আপনাকে ছেড়ে দেবই ভেবেছিলাম। কিন্তু, আপনার অপরাধ তো সীমাহীন। আমি শুনেছি, কয়েকমাস আগে আমরা যখন বিদেশি পণ্য বয়কট করতে বলেছিলাম আপনি তাতেও বাধা দিয়েছিলেন।”
আসামী প্রশান্তস্বরে বললেন, “মহাশয়, সারাজীবন আমি তো স্বদেশী পণ্যই ব্যবহার করে এসেছি। ঋণগ্রস্ত হয়েও স্বদেশী শিল্পের প্রচারে প্রাণপাত করেছি। কিন্তু, যারা হতদরিদ্র, যাদের বেশি দাম দিয়ে স্বদেশী পণ্য কেনার ক্ষমতা নেই তাদের উপর দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে জুলুমবাজি আমি সহ্য করতে পারবনা।
আমি আগেও বলেছি আবারও বলছি, মানবতা চিরকালই আমার কাছে আপনাদের শেখান দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদের থেকে অনেক বেশি মূল্যবান। এতে যদি আপনাদের মনে হয় আমি দেশদ্রোহী, তাহলে আমি গর্বিত আমি দেশদ্রোহী।”

“অসহ্য ! এই কে আছিস এখনি এই দেশদ্রোহীকে নিশ্ছিদ্র কালকুঠুরিতে বন্দী কর। এর চিন্তার কণামাত্রও যেন বেরিয়ে আসতে না পারে।”
বিচারকের নির্দেশ পাওয়ামাত্র গেরুয়া পোশাক পরা যমদূতের মত সেপাইরা তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে এগিয়ে আসতে লাগল।
আমার খুব ইচ্ছা করছিল, আমি তাকে উদ্ধার করি।
আমিও ছুটে গেলাম তাকে বাঁচাতে।
কিন্তু…..
ভোকাট্টা।
শব্দ শুনেই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি ছেলেরা দূরের মাঠে আনন্দে নাচছে।
আদালত কোথায়? সেপাইরা কোথায়? আর সেই আশ্চর্য বৃদ্ধ?
একা ঘরে আমি ঘেমে নেয়ে একশা হচ্ছি।
হাতের কাছেই ‘ঘরে বাইরে’টা পড়ে আছে।
বইয়ের মলাটে বৃদ্ধের হাসিটা কিন্তু একইরকম অমলিন।

If you found this article interesting, please copy the code below to your website.
x 
Share

Leave a Reply