জ্যোতিষশাস্ত্রের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি- প্রবীর ঘোষ

★যুক্তি এক★

জ্যোতিষশাস্ত্র পৃথিবীর সব ধর্মের কাছেই আবহমান কাল থেকে চলে আসছে। কোনও ধর্মই এই শাস্ত্রকে কুসংস্কার মনে করে ত্যাগ করেনি।

★বিপক্ষে যুক্তি★ ধর্মকে জ্যোতিষীরা কী চোখে, কিভাবে দেখে জানি না। আমাদের চোখে একজন বিজ্ঞানমনষ্ক যুক্তিবাদী মানুষ চরম ধার্মিক। তলোয়ারের ধর্ম যেমন তীক্ষ্ণতা, আগুনের ধর্ম যেমন দহন, তেমনই মানুষের ধর্ম মনুষ্যত্বের বিকাশ। 'মনুষ্যত্ব' কী? প্রতিটি বস্তু বা প্রানীর যেমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, তেমন-ই মানুষেরও কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। এই বৈশিষ্ট্য অনড় কিছু নয়। দোষ-গুণ নিয়েই মানুষ। দোষ বেশি থাকলে বলি 'অমানুষ'। মানুষ হয়ে উঠতে গেলে কিছু 'গুণ' থাকা প্রয়োজন। এই দোষ-গুণ বিচার পদ্ধতি গড়ে ওঠা মূল্যবোধের দ্বারা নির্ধারিত হয়। পিছিয়ে থাকা সমাজ সতীদাহ প্রথার উচ্ছেদ, বিধবা বিবাহ প্রথার প্রচলনকে দোষনীয় মনে করেছিল। এগিয়ে থাকা সমাজ 'দোষ' ও 'গুণ' হিসেবে কাকে গ্রহণ করছে, কেন গ্রহণ করছে বুঝতে হবে। এই গুণের সমষ্টিকে আমরা বলতে পারি - 'মনুষ্যত্ববোধ'। সেই হিসেবে প্রকৃত 'যুক্তিমনস্ক' মানবতাবাদীরাই ধার্মিক, কারণ তারা শোষিত মানুষদের মনুষ্যত্ববোধকে বিকশিত করতে চাইছে। চেতনায় বপন করতে চাইছে বাস্তব সত্যকে --তাদের বঞ্চনার প্রতিটি কারণ সমাজ ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সমাজের শোষকের দল চায় না, শোষিতরা জানুক তাদের প্রতিটি বঞ্চনার কারণ লুকিয়ে রয়েছে এই সমাজ-ব্যবস্থার মধ্যেই। স্বর্গের দেবতা, আকাশের নক্ষত্র, পূর্বজন্মের কর্মফল ইত্যাদিকে বঞ্চনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারলে, বিশ্বাস উৎপাদন করতে পারলে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রতিবাদের কন্ঠকে স্তব্ধ করে দিয়ে শোষক-শোষিতের সম্পর্ককে বজায় রাখা যায়। এই সম্পর্ককে কায়েম রাখার চেষ্টাতেই শোষকশ্রেণির স্বার্থে মানুষের স্বাভাবিক যুক্তিকে গুলিয়ে দিতে গড়ে উঠেছে ভাববাদী দর্শন অর্থাৎ অধ্যাত্ববাদী চিন্তাধারা, বিশ্বাসবাদ, গুরুবাদ, ঈশ্বরবাদ ও উপাসনা ধর্মের নানা আচার অনুষ্ঠান। স্বভাবতই তথাকথিত ধর্ম, অধ্যাত্ববাদ, ভাববাদী দর্শন, বিশ্বাসবাদ, ইত্যাদি যুক্তিবাদের প্রবলতম শত্রু।ভাববাদীদের কাছে প্রত্যক্ষ ও প্রতক্ষ-অনুগামী জ্ঞানের গুরুত্ব অতি সামান্য অথবা অবাস্তব। তারা বিশ্বাস করেন শাস্ত্র-বাক্যকে, ধর্মগুরুদের অন্ধ-বিশ্বাসকে - যার উপর দারিয়ে আছে তথাকথিত ধর্ম ও ধর্মের নানা আচার অনুষ্ঠান। যুক্তির কাছে অন্ধ-বিশ্বাস বা ব্যক্তি-বিশ্বাসের কোনও দাম নেই। যুক্তি সিদ্ধান্তে পৌঁছায় পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জ্ঞানের পথ ধরে। যুক্তিবাদের কাছে তথাকথিত ধর্মই যখন অন্ধ-বিশ্বাস হিসেবে বাতিল তালিকাভুক্ত, তখন ধর্মবিশ্বাস জ্যোতিষশাস্ত্রকে গ্রহণ করল অথবা করল না, তাতে যুক্তিবাদের কী এল গেল?

★যুক্তি দুই★ জ্যোতিষীরা অনেকসময় জ্যোতিষবিচারে ভুল করেন। কিন্তু জ্যোতিষীদের ভুলের দ্বারা প্রমাণিত হয় না যে, জ্যোতিষশাস্ত্র ভুল। যেমন, চিকিৎসকরা ভুল করলে প্রমাণ হয় না চিকিৎসাশাস্ত্র ভুল।

★বিপক্ষে যুক্তি★ চিকিৎসাবিজ্ঞান একটি প্রমাণিত বিজ্ঞান। অর্থাৎ বিজ্ঞান চিকিৎসাববিজ্ঞানকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞান বিজ্ঞানের দরবারে বিজ্ঞানের নিয়ম (..) অনুসরণ করে প্রমাণ করেছে তার যথার্থতা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্যগুলো একই শর্তাধীন অবস্থায় বিভিন্ন পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে পরীক্ষক বিজ্ঞানীদের দ্বারা সমর্থিত হয়েছে। আরো একটু সরল করে বলতে পারি, কোন কোন ভাইরাস বা ব্যাসিলির জন্য কী কী রোগ হয়, তা অনুবীক্ষণ বা অন্যান্য যন্ত্রের সাহায্যে বিভিন্ন গবেষণাগারে পরীক্ষা করার পর কারও আবিস্কার বা মতামতকে পরীক্ষক বিজ্ঞানীরা স্বীকৃতি দিয়েছেন। আবিষ্কৃত ওষুধের ক্ষেত্রেও টেস্টটিউব, ওষুধ প্রয়োগ করে দেখা হয় বিশেষ ওষুধে জীবাণু ধ্বংস হচ্ছে কি না। টেস্টটিউব জীবজন্তু ও মানুষের শরীরে প্রয়োজনীয় জীবাণু প্রবেশ করিয়ে তারপর ওষুধ প্রয়োগ করে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে ফলাফল দেখাযায়। কেবলমাত্র এইসব পরীক্ষার সাফল্য লাভ করলে আসে স্বীকৃতি। তাই একজন চিকিৎসকের ভুলের জন্য বা একজনের মৃত্যুতে চিকিৎসাশাস্ত্রের অসারতা প্রমাণিত হয় না।

★যুক্তি তিন★ ★বিজ্ঞান কি প্রমাণ করতে পারবে - জ্যোতিষশাস্ত্র বিজ্ঞান নয়?

★বিরুদ্ধ যুক্তি★---দাবির যথার্থতা প্রমাণের দ্বায়িত্ব সব সময়েই দাবিদারের। জ্যোতিষশাস্ত্রকে বিজ্ঞান বলে প্রমাণ করার যাবতীয় দায় - দ্বায়িত্ব জ্যোতিষীদের। (.............)"আমি দেখেছি দেখেছি তিন বার জোড়া পায়ে লাফালে অনেক সময় আমারউচ্চতা ঠিক তিন ইঞ্চি বেড়ে যায়"(............)"সরি, আমি অন্তত আপনার কথায় বিশ্বাস করতে পারছি না। এবং আশা করি কোনও যুক্তিবাদী মানুষই আপনার দাবিকে শুধুমাত্র আপনার মুখের কথার উপর নির্ভর করে মেনে নেবেন না "(..........)"অর্থাৎ আপনি আমাকে অবিশ্বাস করছেন। কিন্তু আমার এই ব্যর্থতার দ্বারা আদৌ প্রমাণ হয় না আমি মিথ্যেবাদী। আপনি প্রমাণ করতে পারবেন -- আমি কোনও দিনই লাগে তিন ইঞ্চি লম্বা হইনি? "(..........)"আমার প্রমাণ করার কথা আসছে কোথা থেকে? আপনি ভালভাবেই জানেন, এমনটা প্রমাণ করা আমার কেন, কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। দাবি করেছেন আপনি। সুতরাং দাবির যথার্থতা প্রমাণের দ্বায়িত্ব আপনারই। " (..........)"সত্যিই সুন্দর যুক্তি দিয়েছেন। এই যুক্তিটা আপনার মুখ থেকে বের করতেই লাফিয়ে লম্বা হওয়া গল্পটি ফেঁদেছিলাম "। উপস্থিত শ্রোতারা তুমুল হাসিয়ে আর হাততালিতে বুঝিয়ে দিলেন, আমার যুক্তি তাঁদের খুবই মনের মত ও উপভোগ্য হয়েছে। [উদাহরণ সহ একটি বড় ঘটনার কয়েকটি লাইন তুলে দেওয়া হল - - বিস্তারিত বইয়ের পাতায়]

★যুক্তি★চার★ জাতকের ভবিষ্যৎ বিচারে অনেক সময় জ্যোতিষীদের ভুল হয় বই কী। কারণ পুরুষকার দ্বারা নিজের ভাগ্যকে পাল্টে দিতে পারে মানুষ। প্রাচীন ঋষিরাও ভাগ্য পরিবর্তনে পুরুষকারের ভূমিকার কথা স্বীকার করেছেন। মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন, "যেমন একটি চাকার সাহায্যে রথের গতি ক্রিয়াশীল হয় না, দুটি চাকাই অপরিহার্য তেমনি পুরুষকার ছাড়া কেবলমাত্র ভাগ্য সহায়ে সব সময় সিদ্ধিলাভ হয় না। "

★বিরুদ্ধে যুক্তি ★ জ্যোতিষশাস্ত্রকার ও জ্যোতিষীরা বলেন -- ভাগ্য পূর্ব নির্ধারিত। অর্থাৎ একজন জাতকের জীবনে প্রতিটি মুহূর্ত প্রতিটি ঘটনাই পূর্বনির্ধারিত। আগে থেকে ঠিক করাই আছে, এর পরিবর্তন কোনওভাবেই সম্ভব নয়। কারণ, পরিবর্তন সম্ভব হলে 'পূর্বনির্ধারিত' কথাটিই অর্থহীন হয়ে পড়ে। একজনও যদি নিজ চেষ্টায় পুরুষকারের দ্বারা নিজ ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষমই হন, তবে তো জ্যোতিষশাস্ত্রের 'ভাগ্য পূর্বনির্ধারিত' তত্ত্বই ভেঙে পড়ে। আর এই তত্ত্বের ওপর নির্ভর করেই অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত গণনা করা হয়। ধরা গেল, রামবাবু দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান। ভাগ্যে নির্ধারিত হয়ে রয়েছে -- বিদ্যের দৌড় পাঠশালার গন্ডি পার হয়ে আর এগুবে না। প্রায় রুটিন মাফিক জীবনযাত্রা। সকাল থেকে সন্ধে হাড়ভাঙা খাটুনি ;পরের জমিতে হাল চালান, ফসল বোনা, মজুর খাটা, ঘর ছাওয়া, বিনিময়ে জোটে আধপেটা খাওয়া। অল্পবয়সে বিয়ে। বিপুল সংখ্যক রুগণ সন্তান। কিছু সন্তানের অকাল মৃত্যু। জীবিত সন্তানদের ভাগ্যে রয়েছে শিশু-শ্রমিক হওয়া। স্ত্রীর ভাগ্যে রক্ত-স্বল্পতা। পরিবারের প্রত্যেকের ভাগ্যে আছে রোগ-ভোগ, বিনা চিকিৎসায় রোগকে ভোগ। রামবাবু পুরুষকারের দ্বারা, প্রয়াস দ্বারা বিদ্যায়, বুদ্ধিতে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন। দেশবাসীর কাছে হয়ে উঠলেন পরম শ্রদ্ধেয় বিয়ে করলেন সহকর্মী অধ্যাপিকাকে। সন্তান সংখ্যা দু'য়ে সীমাবদ্ধ। অসুখ হলে ঔষধ আসে, চিকিৎসক আসেন। সংসারে বৈভব না থাকলেও স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব নেই। স্বাস্থোজ্জ্বল সুন্দর ছেলে উজ্জ্বল ডাক্তারি পড়বার পাশাপাশি ক্রিকেট খেলে সুন্দর। মেয়ে জয়া গানের তালিম নেয় প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞের কাছে। ক্লাস টেনএ পড়ে। ইতিমধ্যেই সঙ্গীত জগতের বিরল প্রতিভা হিসেবে সাড়া জাগিয়েছে। এ-ক্ষেত্রে আমরা কী দেখলাম? রামবাবু তার পুরুষকার দ্বারা শুধুমাত্র নিজের ভাগ্যের পূর্বনির্ধারিত ঘটনাগুলোকেই বদলে দেননি ; বদলে গেছে তাঁর স্ত্রীর রক্তস্বল্পতায় ভোগা হাড়ভাঙা খাটুনির জীবন। সন্তানদের ভাগ্যে রুগণতা থাবা বসাতে ব্যর্থ হয়েছে। থাবা বসাতে ব্যর্থ হয়েছে মৃত্যুও। এর পর সাধারণ যুক্তিতে আর একটি প্রশ্ন অবশ্যই বিশালভাবে নাড়া দেয়, তা হল, জ্যোতিষীরা একই সঙ্গে বলেছেন মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত নির্ধারিত হয়েই রয়েছে, অর্থাৎ অলঙ্ঘণীয়, অর্থাৎ কোনও ভাবেই পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। জ্যোতিষশাস্ত্রের সাহায্যে এই পূর্ব নির্ধারিত ঘটনার হদিশই গণনা করে বের করা হয়। জীবনের কোনও একটি ঘটনার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হলে ভাগ্য 'নির্ধারিত', 'অলঙ্ঘনীয়', ইত্যাদি দাবিগুলোই চূড়ান্ত মিথ্যে হয়ে যায়। পুরুষকার দ্বারা যদি ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানোইই যায়, তবে ভাগ্যকে অপরিবর্তনীয় বলা যায় কোন যুক্তিতে? যে সব জ্যোতিষী এমন উদ্ভট, যুক্তিহীন, স্ববিরোধী বক্তব্য রাখেন, তাঁরা হয় আকাট মূর্খ, নয় ধুরন্ধর বদমাইশ। পুরুষকার নিয়ে দু-একটি কথা বললে নিশ্চই অপ্রাসঙ্গিক হবে না। পুরুষকার কথার অর্থ 'উদ্যোগ' 'কর্ম প্রচেষ্টা'। প্রাকৃতিক আর্থসামাজিক, সমাজ-সাংস্কৃতিক, সু-পরিবেশযুক্ত সমাজে, উন্নত সমাজে মানুষের উদ্যোগ বা কর্মপ্রচেষ্টা সার্থকতা খুঁজে পায়। কিন্তু অনুন্নত পিছিয়ে পড়া সমাজে যেখানে জীবনযুদ্ধে পদে পদে অনিশ্চয়তা, ন্যায়নীতির অভাব, সেখানে পুরুষকার বা কর্মপ্রচেষ্টা বহুক্ষেত্রেই ঐকান্তিকতা সত্ত্বেও ব্যর্থ হয় বার বার। উদাহরণ হিসেবে আমরা নিশ্চই ভাবতে পারি, যে দেশে বারো কোটি বেকার, সে দেশের বারো লক্ষ মানুষের কর্ম-সংস্থানের ব্যবস্থা যদি হয় তবে, শতকরা মাত্র একজনের বেকারত্ব ঘুচবে। শতকরা নিরানব্বইজনই থেকে যাবে বেকার। শতকরা দশজন বেকার যদি কর্মপ্রচেষ্টারর দ্বারা, পুরুষকার দ্বারা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাকরি খুঁজে পেতে বিভিন্ন ভাবে নিজেকে প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষার উপযুক্ত করে গড়েও তোলে তবুও প্রতি দশজনের মধ্যে ন'জনের পুরুষকারই জীবনযুদ্ধে বয়ে নিয়ে আসবে কেবলমাত্র ক্লান্তি ও ব্যর্থতা। কোনও দেশে উচ্চ শিক্ষাদানের ব্যবস্থা যদি থাকে পঞ্চাশ হাজার মানুষের জন্য, তবে পাঁচ লক্ষ মানুষ পুরুষকার দ্বারা, প্রচেষ্টার দ্বারা নিজেদের উচ্চশিক্ষা লাভের উপযুক্ত করে গড়ে তুললেও চার লক্ষ পঞ্চাশ হাজার মানুষের পুরুষকারই চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হতে বাধ্য। একজন মানুষের উদ্যোগ, কর্মপ্রচেষ্টা বা পুরুষকার কতটা সাফল্য পাবে, সেটা পরিপূর্ণভাবে নির্ভর করে সেই মানুষটি কোন সমাজ ব্যবস্থায় বাস করেন তার ওপর। অতএব ভাগ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে পুরুষকারের ভূমিকার জ্যোতিষতত্ত্ব শুধুমাত্র পরস্পরবিরোধীই নয়, সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে অজ্ঞতারও ফসল।

★যুক্তি সাত ★ জ্যোতিষীর ব্যার্থতার একটি প্রধান কারণ জাতকের জন্ম সময়ের ভ্রান্তি। জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রধান অবলম্বন জন্ম-সময়। বেশিরভাগ ঘড়িই ঠিক সময় দেয় না। দিলেও ঠিক জন্ম মুহূর্তেই ঘড়ির সঠিক সময় দেখা অনেক সময় সম্ভব হয় না। হাসপাতালে সঠিক জন্ম সময় রাখার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই জাতকের জন্ম-সময় ঠিক থাকে না। জন্ম সময়ের ত্রুটির জন্য জন্মকালীন গ্রহ-অবস্থান নির্ণয়ের ভুল হয়। ভুলের ওপর নির্ভরকরে জ্যোতিষবিচার করলে ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ভুলের দ্বায়িত্ব জাতকের জন্ম-সময় রক্ষাকারীর, জ্যোতিষীর নয়।

★বিরুদ্ধ যুক্তি ★ যারা জ্যোতিষ ব্যাবসা ফেঁদে বসেছেন, তাঁরা জাতকদের দেওয়া জন্ম-সময় দেখেই তো গণনা করেন এবং সেই গণনার উপর ভিত্তি করে নানা সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে দামি দামি গ্রহরত্ন কেনান। এই সময় তো তাঁরা ভুলে থাকতে ভালবাসেন যে, শতকরা প্রায় একশোভাগ জাতকের ক্ষেত্রেই সঠিক সময় লিপিবদ্ধ করা হয়নি। জ্যোতিষীরা তখন তো জাতকদের জন্ম-সময় ভ্রান্তির প্রসঙ্গ তুলে ক্লায়েন্টদের ফিরিয়ে দেন না? বলেন না, আপনাদের জন্ম-সময় যেহেতু সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শুন্য, তাই আমাদের এ বিষয়ে সঠিক গণনা করার সম্ভাবনাও শুন্য। জ্যোতিষশাস্ত্র মতে বাস্তবিকই জন্ম সময় কতটা নিখুঁত হওয়া প্রয়োজন? একটু দেখা যাক। ফলিত জ্যোতিষ নিয়ে পড়াশুনা করেছি। পড়ে বাস্তবক্ষেত্রে পরীক্ষা করে স্পষ্টতই বুঝেছি ফলিত জ্যোতিষ নেহাতই একটা চান্সের ব্যাপার। অর্থাৎ মিলতেও পারে, নাও মিলতে পারে। আবার জ্যোতিষশাস্ত্র মতে গণনা না করে, জাতকদের বাহিক্যভাবে দেখে, তার আচার-আচরণ বিচার করে, কথাবার্তার ধরন দেখে তাদের সম্বন্ধে অনেক কিছু ঠিক ঠাক বলে দিয়ে বহু জাতককেই বিস্মিত করে দিয়েছি। একজনের জামা, কাপড়, জুতোর,ঘড়ি, চেহারা, চোখ, কথাবার্তা অনেক সময়ই তার আর্থিক অবস্থা, রুচি, শিক্ষাদীক্ষা, কোন পরিবেশে মানুষ, কোন বিষয়ে উৎসাহী ইত্যাদির হদিস দেয়। চোখ-মুখের চেহারা, শরীরের গঠন, শ্বাস নেবার শব্দ, বসার অস্বস্তি ইত্যাদি দেখে ব্লাড-সুগারের রোগী, কোলেস্টেরলের রোগী, হৃদরোগী, পেটের গোলমালের রোগী, হাঁপানি রোগী বা অর্শরোগীকে অনেক সময়ই চিহ্নিত করা যায়। জাতক কী ধরনের প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন জানা থাকলে অনেক সময় বলা সম্ভব, "আপনি নিজের চেষ্টায় দাঁড়িয়েছেন", "আপনার প্রতিষ্ঠার পিছনে রয়েছে অন্যের সাহায্যের হাত "ইত্যাদি। চেহারা দেখেই অনেক সময় বলে দেওয়া যায়, "আপনার জীবনে অনেক নারী /পুরুষ আসবে "।অনেক অর্ধ-প্রতিষ্ঠিত বা প্রতিষ্ঠিত মানুষকে যদি বলেন, "আপনার যতখানি নাম-যশ, প্রতিষ্ঠা পাওয়া উচিত ছিল তা আপনি পাননি "। দেখবেন জাতক আপনার কথায় বেজায় খুশি হয়ে উঠবে। আপনি একটু বুঝে - সমঝে কাউকে যদি বলেন, "পরিবারে জন্য, বন্ধুবান্ধবদের জন্য আপনি প্রচুর ত্যাগ স্বীকার করেছেন, কিন্তু বিনিময়ে অনেক সময়ই তাদের কাছ থেকে আন্তরিক, কৃতজ্ঞ ব্যবহার পাননি, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁরা অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন "। দেখবেন জাতক ভাবাবেগের শিকার হয়ে পড়েছেন, অনেক গোপন খবরই আপনার কাছে গড় গড় করে বলে চলেছেন। একজনের চেহারা দেখলে, কথা শুনলে তার মানসিকতার আঁচ করাও অনেক ক্ষেত্রেই মোটেই কঠিন ব্যাপার নয়। আপনি দু-একটি কথা বলে জাতকের আস্থা পেলেই দেখবেন, জাতক আপনাকে আপনজন মনে করে মনের জানালা খুলে দিয়েছেন। আপনার কাছ থেকে সহানুভূতি শুনে, মনের মত কথা শুনে এইসব জাতকরাই পরিচিত জনের কাছে আপনার গুণগানে পঞ্চমুখ হবেন। প্রেম বা বিয়ের ক্ষেত্রে "ধরি মাছ, না ছুই পানি " করলে তো পোয়াবারো। না হলেও সফলতা বা বিফলতা, যে পক্ষেই মত দিন মোটামুটি শতকরা পঞ্চাশ ভাগ ঠিক বা ভুল ঘটারই সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। ঠিক হলে নাম আরও বাড়বে। ভুল হলে চিন্তিত হবার প্রয়োজন নেই। জাতকের আবেগকে ঠিকমত সুড়সুড়ি দিন, তার প্রতি সহানুভূতি জানান, দেখবেন তিনিও আপনার ভক্ত হয়ে উঠেছেন। জাতক তখন অন্যদের কাছে আপনার প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলার সময় আপনার জ্যোতিষবিচারের ব্যার্থতার দিকগুলো এড়িয়ে সফলতার প্রসঙ্গ এনে আপনার জ্যোতিষবিচারের অভ্রান্ততার কথাই প্রমাণ করতে চাইবেন। আমাদের দেশের সমাজব্যবস্থায় জ্যোতিষীর কাছে যারা যান, তাদের বেশিরভাগই সমস্যাপীড়িত অথবা জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাসী। তাদের এই বিশ্বাস পরিবেশগত ভাবেই এসেছে। তাই জ্যোতিষীরা যখন এইসব জাতকদের বাহিক্যভাবে দেখে আচার-আচরণ শুনে অনেক কিছু বলে যান, তখন জাতকরা মিলে যাওয়া কথা গুলোই মনে রাখেন। না মেলা কথাগুলো ভুলে যান। এইসব জাতকরা কিন্তু অবশ্যই চান, জ্যোতিষীটির প্রতি তার একান্ত বিশ্বাস আপনার মধ্যেও সংক্রামিত করতে। আবার বলি, এইসব মিলে যাওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক বা বেঠিক জন্ম - সময় আদৌ কাজ করে না। তিনিই সফল জ্যোতিষী, যিনি মানুষের মন ভাল বোঝেন। জ্যোতিষী অমৃতলাল "জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণী কেন মেলে না "শিরোনামের প্রবন্ধে জানাচ্ছেন, ভবিষ্যদ্বাণীকে সফল করতে হলে জ্যোতিষীদের হতে হবে মনস্তাত্ত্বিক, তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, ব্যক্তিত্বসঅসম্পন্ন। অমৃতলাল বাস্তবিকই ঠিক কথা বলেছেন। সফল জ্যোতিষী হতে এইসব গুণেরই প্রয়োজন, জাতকের সঠিক জন্ম সময় নয়। (বিস্তারিত বইএর পাতায় )।

★যুক্তি আট(৮)★ জ্যোতিষীরা জ্যোতিষশাস্ত্রের পক্ষে যে-সব যুক্তি হাজির করেন। ১৯৭৫ -এর সেপ্টেম্বরে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের হিউম্যানিস্ট পত্রিকায় ১৮৬ জন বিজ্ঞানীর জ্যোতিষ - বিরোধী বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। এঁদের অনেকেই প্রতিষ্ঠিত। ১৮ জন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এও সত্যি। কিন্তু এ-কথাও সত্যি এই ১৮৬ জন বিজ্ঞানী নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বা জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে পরীক্ষা করে তারপর এই ধরনের সিদ্ধান্তে তাঁরা পৌঁছোননি। বক্তব্যটি খসড়া করেছিলেন বিজ্ঞানী বার্ট জে বোক। অন্যরা জ্যোতিষচর্চা না করেই অর্থাৎ জ্যোতিষশাস্ত্রের সত্যতা কাছে কিনা তা না জেনেই স্বাক্ষর করেছিলেন - এই মাত্র। যে দেশে বিজ্ঞানীর সংখ্যা কুড়ি লক্ষ, সেখানে জ্যোতিষবিরোধীতা করেছেন মাত্র ১৮৬ জন। ১৮৬ জন বিজ্ঞানীর জ্যোতিষবিরোধীতাকে জ্যোতিষশাস্ত্রের ভ্রান্তির অকাট্য প্রমাণ বলে যুক্তিবাদীরা হইচই করে বেড়াচ্ছেন। তাদের যদি প্রমাণ করে দিই এর চেয়েও বেশি সংখ্যক বিজ্ঞানীরা জ্যোতিষশাস্ত্রের সপক্ষে মত প্রকাশ করেছেন, তখন কি তারা মেনে নেবেন - জ্যোতিষশাস্ত্র বিজ্ঞান? "পরাশর, ভৃগু, জেমিনি, বরাহমিহির প্রমুখ ঋষিরা যে শাস্ত্রের প্রণেতা সেই শাস্ত্রকে মিথ্যা বা অসভ্য মানুষের বিশ্বাস বলে মনে করলে, তাদেরও মিথ্যাবাদী এবং অসভ্য বলে মেনে নিতে হয়। তারা অসভ্য হলে আমরা তাদের বংশধররাও অসভ্য বলে চিহ্নিত হই। "এছাড়া পৃথিবী বিখ্যাত প্রাচীন বিজ্ঞানী পিথাগোরাস, টলেমি,গ্যালিলিও, টাইকো,ব্রাহে, কেপলার, ভাস্কর, শ্রীপতি, প্রমুখ এবং বর্তমানকালের বহু বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীরা যে শাস্ত্রের পক্ষে বলিষ্ঠ মত প্রকাশ করেছেন, সেই শাস্ত্রে আস্থা জানাতে লজ্জা কোথায়? " এই যুক্তিটুকু ডঃঅসিত চক্রবর্তীর 'জ্যোতিষ-বিজ্ঞান কথা' বইটির পৃষ্ঠা ৫৭ থেকে তুলে দিয়েছি, জ্যোতিষশাস্ত্রকে বিজ্ঞান বলে প্রমাণ করতে এই ধরনের আক্রমণমুখী যুক্তি বহু জ্যোতিষীদের কাছেই খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

★বিরুদ্ধ যুক্তি ★ জ্যোতিষশাস্ত্রের পক্ষে বা বিপক্ষে কতজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মত প্রকাশ করলেন এমন সংখ্যাতত্ত্বের নিরিখে কোনও মতকে মেনে নেওয়া যুক্তিবাদের কাছে একান্তভাবেই মূল্যহীন। কারণ বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিনির্ভর মানুষ সিদ্ধান্তে পৌছতে চায় পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। কোন পক্ষ সংখ্যাগুরু, কোনপক্ষে নামী-দামিদের সমর্থন বেশি, তা দেখে নয়। ইতিহাস বার বার এ শিক্ষাই দিয়েছে, বহু ক্ষেত্রেই সংখ্যাগুরুদের, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের মতামতও বাতিল হয়েছে। তেমনটি না হলে আজও আমাদের মেনে নিতে হত ভূ-কেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বকে। অতএব আমি চাই যুক্তিনির্ভর মানসিকতা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌছতে। জ্যোতির্বিজ্ঞান যখন জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষশাস্ত্র এই দুটি শাখায় ভাগ হয়ে যায়, ভাগ হওয়ার আগে বহু জ্যোতির্বিজ্ঞানী বিজ্ঞান সাধনার পাশাপাশি কৌতুহলবশত অথবা দ্বিধাগ্রস্থভাবে অথবা বিশ্বাস নিয়ে জ্যোতিষচর্চায় মনোনিবেশ করেছিলেন। ফলে জ্যোতিষশাস্ত্র কলেবরে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু শ্রদ্ধেয় বহু জ্যোতির্বিজ্ঞানী জ্যোতিষে বিশ্বাস করতেন, অথবা এ-যুগের কিছু বিজ্ঞানী ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব জ্যোতিষে বিশ্বাস করেন --এই যুক্তিতে জ্যোতিষশাস্ত্রের সত্যতা প্রমাণিত হয় না। কারণ বিজ্ঞানের কাছে ব্যক্তি-বিশ্বাসের দাম এক কানা-কড়িও নয়। প্রাচীন যুগের বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা 'অসভ্য' বা 'মিথ্যাবাদী' এমন অভিযোগ কোনও যুক্তিবাদী বা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ তুলেছেন --এমনটা আমার জানা নেই। অনুমান করতে অসুবিধে হয় না, সাধারণ মানুষদের বিভ্রান্ত করতে, তাদের আবেগকে সুড়সুড়ি দিতেই এমন সব অশালীন, স্পর্শকাতর কথা বলেছেন কিছু জ্যোতিষী। তবে পাশাপাশি এ-কথাও স্মরণযোগ্য, প্রাচীন যুগের বহু জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাই ভূ-কেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বে বিশ্বাস করতেন, বরাহমিহির একটি পতাকা পুঁতে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, পৃথিবী স্থির নেই বলেই পতাকা একটা নির্দিষ্ট দিকে ওড়ে না। পৃথিবী ঘুরলে বাতাসে পতাকা শুধু একই দিকে উড়ত ; যেমন একটা পতাকা হাতে কেউ দৌড়তে থাকলে পতাকা তার বিপরীত দিকেই ওড়ে। অসভ্য মানুষদের বংশধররাও অসভ্যই থেকে যাবে, এমনটা ডঃ চক্রবর্তীর কেন মনে হল, বুঝলাম না। এটা তো বাস্তব - সত্য, এক সময় মানুষ অসভ্যই ছিল, ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়েই আমরা বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছি।

★যুক্তি★দশ(১০)★ বিশ্বের বহু বরেণ্য বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রেই তাঁদের নবতম আবিস্কারকে, তাদের দেওয়া নবতম তত্ত্বকে বিজ্ঞানীরাই সবচেয়ে বেশি সন্দেহের চোখে দেখেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হয়েছে। সন্ধিগ্ধ বিজ্ঞানীরা ওইসব বরেণ্যদের মতামতকে শেষপর্যন্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। আজ কিছু বিজ্ঞানীদের জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি সন্দেহ আদৌ প্রমাণিত হয় না যে জ্যোতিষশাস্ত্র অপবিজ্ঞান, বিজ্ঞানীদের সন্দেহই যদি শেষ কথা হত, তবে নিউটন থেকে শুরু করে বহু বিজ্ঞানীই চূড়ান্ত শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারতেন না।

★বিরুদ্ধ যুক্তি ★ বিজ্ঞান যেহেতু শৃঙ্খলাবদ্ধ জ্ঞানের সাহায্যে পরীক্ষা পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়েই সিদ্ধান্তে পৌঁছয়, তাই প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই আসে পরীক্ষার প্রশ্ন, জিজ্ঞাসার প্রশ্ন সন্দেহের প্রশ্ন। এ-সবের পরিবর্তে ব্যক্তি - বিশ্বাসকে মর্যাদা দিতে গেলে, ব্যক্তি বিশ্বাস বা ব্যক্তির দাবিকে বিনাপ্রশ্নে মেনে নিলে বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান থাকত না। পরীক্ষিত সত্যকে বিজ্ঞান মর্যাদা দেয়। জ্যোতিষশাস্ত্র যেদিন তাদের দাবির সত্যতা প্রমাণ করতে সক্ষম হবে, সেদিন নিশ্চয়ই বিজ্ঞান জ্যোতিষশাস্ত্রকেও মর্যাদা দেবে। কোনও দাবিকে পরীক্ষা না করেই সন্দেহাতীতভাবে মেনে নেওয়া কি সুযুক্তির লক্ষণ বলে জ্যোতিষীরা মনে করেন? আমিই যদি আজ দাবি জানাই, রাত ঠিক বারোটায় আমার হাত দুটো ডানা হয়ে যায়, আমি তখন আকাশে উড়ে বেড়াই। রাত একটায় ডানা দুটো আবার হাত হয়ে যায়, তার আগেই আমি নেমে আসি মাটির পৃথীবিতে ; আমার এই দাবি কি বিনা সন্দেহে, বিনা প্রশ্নে, বিনা পরীক্ষায় জ্যোতিষীরা মেনে নেবেন? তেমনটা যদি কোনও জ্যোতিষী মেনে নেন, তবে তাঁর মানসিক সুস্থতা সম্বন্ধে যুক্তিবাদীরা কিন্তু সন্দেহ প্রকাশ করবেনই।

★যুক্তি ★এগারো★ জ্যোতিষীরা অনেক ভবিষ্যদ্বাণী মিলিয়ে দিছেন। আর মিলিয়ে দিচ্ছেন বলেই জ্যোতিষশাস্ত্র সংখ্যাগুরু মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছে। জ্যোতিষীরা বিশ্বাস অর্জন করতে না পারলে, সাধারণ মানুষ জ্যোতিষীদের কাছে আরও বেশি বেশি করে হাজির হবেন কেন? জ্যোতিষীরা যে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী মেলান, এবং এটা যে কোনও মিথ্যা প্রচার বা দাবি নয়, সাক্ষী হিসেবে মিলবে প্রচুর প্রত্যক্ষদর্শী বা প্রত্যক্ষভোগী।

★বিরুদ্ধ যুক্তি ★ জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণীর কিছু মেলে, আবার কিছু মেলে না। কেন মেলে, কেন মেলে না? "সংখ্যাগুরু মানুষদের জ্যোতিষে বিশ্বাসের কারণ জ্যোতিষীদের অভ্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী " জ্যোতিষীদের এমন দাবিকে মেনে নেওয়ার পক্ষে কোনও যুক্তি দেখি না। জুলাই ২০০৭ - এ সন্ধ্যা, আমাদের সমিতির দমদমের স্টাডি ক্লাসে এলেন বিপ্লব কুমার। ক্লাসে একঘর লোক। আমার অনুরোধে কিঞ্চিৎ করিশ্মা দেখালেন। একজনকে বললেন, "আপনার পিঠে শিরদাঁড়ার ডানদিকে একটা কালো তিল আছে "---সত্যিই দেখা গেল তার পিঠে শিরদাঁড়ার ডানপাশে একটি তিল। একজনকে বললেন আপনার "আপনার ডানো পায়ের উরুর নীচে একটা কাটা দাগ আছে। " হ্যাঁ, সত্যিই কাটা দাগ মিলল। ৫৫ বছরের এক ভদ্রলোককে বললেন, "বছর পনেরো আগে আপনার সামনে একটা বড় সুযোগ এসেছিল। সেই সময় সুযোগটা নিলে আজ আপনার জীবনটাই পাল্টে যেত। "---ভদ্রলোক মাথা চুলকে বললেন "একদম ঠিক।" তাঁর চোখে মুখে বিস্ময়ের ছোঁয়া। একজনকে বললেন, "এক হাতের মুঠোয় সুখ, আর এক হাতের মুঠোয় দুঃখকে ধরুন...ধরুন,ধরুন, চটপট একটা হাতকে মুঠোবন্দী করে ভাবুন - মুঠোর ভিতর রয়েছে সুখ, আর এক হাতকে মুঠোবন্দী করে ভাবুন --মুঠোর ভিতর রয়েছে দুঃখ "। সে মুঠোবন্দী করতেই চোখে মুখে কথা বলা বিপ্লব কুমার বললেন, "আপনার ডান মুঠোয় সুখ, বাঁ মুঠোয় দুঃখ, তাই ভেবেছিলেন তো? তিনি তো ভ্যাবাচ্যাকা, বললেন "হ্যাঁ।" এইসব ক্ষমতা দেখিয়ে বিপ্লব জ্যোতিষী বা তান্ত্রিক হয়ে বসতে পারতেন। বসেননি। তিনি জানেন --বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের নানা জায়গায় তিল জন্মায়। তিরিশের যুবকের পিঠে একটাও তিল থাকবেনা --এটা হতেই পারে না। বয়স ২৮শের তেজি যুবককে দেখলে বোঝা যায় এক সময় খেলাধুলা করেছেন। বাংলার তরুণ কৈশোরে যে বেসবল না খেলে ফুটবল খেলবে --এটা অনুমান করাই যায়। ফুটবল খেললে ডানপায়ের খেলোয়াড় হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৯৯ ভাগ। অতএব ডান পা'য়ে একটা - আধটা কাটা দাগ থাকবেই থাকবে। বছর ৫৫-৬০ এর মধ্যবিত্তকে বলুন, বছর পনেরো আগে আপনার কাছে একটা দারুণ সুযোগ এসেছিল.....। প্রায় ১০০ ভাগ ক্ষেত্রেই উত্তরটা পাবেন, "হ্যাঁ ঠিক..... ঠিক। " আপনি ১০০ লোককে বলুন, একহাতে সুখ, আর এক হাতে দুঃখকে ধরতে, শতকরা প্রায় ১০০ ভাগ লোকই অজানতেই তার কাজের হাত দিয়ে প্রিয় 'সুখ' ধরতে চাইবে। অপ্রিয় 'দুঃখ'কে ধরবে অকেজো বাঁ হাত দিয়ে। যারা বাঁ-হাতি, তারা অবশ্য সুখ ধরবে বাঁ হাতে। সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে জ্যোতিষী বা তান্ত্রিক সেজে পকেট কাটা সম্ভব। বিশ্বাস অর্জন করে তারপর পকেট কাটা। অনেকেই জ্যোতিষীদের কাছে হাজির হন বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হয়ে। 'বহু রাজনৈতিক ঘটনার সফল ভবিষ্যদ্বক্তা ', 'বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান মানুষদের পরম বিশ্বাসভাজন জ্যোতিষী ', 'অলৌকিক ক্ষমতাবান জ্যোতিষী ', 'ইত্যাদি নানা বিশেষণে নিজেদের বিশেষিত করা প্রতারকের অভাব নেই। ঠকার মতো; লোভী মানুষের কখনই অভাব হয় না বলেই ঠকবাজেরা আজও ভালভাবেই করে খাচ্ছে। আজও এমন মানুষ আছে যারা অলৌকিক বাবার হাতে মোটা অর্থ বা গহনা তুলে দেন-- দ্বিগুণ বা আরও বেশি পাবার আশায়। ওরা ঠকে, তবু ঠকে যাবার জন্য তৈরি লোভী লোকের অভাব হয় না। ★যে সমাজে অনিশ্চয়তা বেশি, সেই সমাজ - ব্যবস্থায় ঈশ্বর, জ্যোতিষ, ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীলতা বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। বিপদগ্রস্ত, দিশা না পাওয়া, বাস্তব কোনও কিছুর ওপর ভরসা রাখতে না পারা মানুষ শেষ ভরসা হিসেবে অনেক সময়ই নিজেকে ভাগ্যের বা ঈশ্বরের হাতে সঁপে দেয়।★ মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা যত বাড়তে থাকে, ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীলতাও ততই বাড়তে থাকে। অনিশ্চয়তা থেকেই প্রধান ভাগ্য - বিশ্বাসের সৃষ্টি। একটা সময় ছিল, স্কুলের গন্ডি পেরুলেই চাকরি জুটত। এখনকার মত মাস্টারডিগ্রি নিয়ে বেকার বসে থাকতে হত না। তাই কর্মভাগ্যের তেমন কোনও গুরুত্বই ছিল না। যে সমাজ - ব্যবস্থায় বেকার মানুষের সংখ্যা প্রায় শুন্যের কোঠায়, সেখানকার মানুষগুলোর দশমপতিগ্রহ অর্থাৎ কর্মপতিগ্রহ নেহাতই অসহায়। ধনবান দেশের মানুষদের দ্বিতীয়পতি গুরুত্বইই নেই। সে বিরূপা বা নিম্নস্থ হলেও জাতকের ধনসম্পদ সামান্যতম কমবে না। সমাজে যখন ন্যায়নীতির অভাব ও অসাম্য দেখা যায়, তখন সুযোগ পাওয়া ও শুযোগ না পাওয়া প্রতিটি মানুষ ভাগ্যে বিশ্বাসী হয়ে পড়ে। দেশের বেকারের সংখ্যা যদি ১০ কোটি ও চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয় ১ লক্ষ তবে স্বভাবতই আসে দুর্নীতি, অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইত্যাদি। যোগ্যতা থাকতেও বেকার থাকতে হয়। অযোগ্যও বেকারত্ব ঘুচায় দুর্নীতির কৃপায়। মন্ত্রী ধরে দুর্নীতিক অযোগ্য মানুষ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের কল্যাণে বিদেশ ঘুরে আসে। কেউ বা রাজনৈতিক দলের বিরাগভাজন হয়ে কালো তালিকাভুক্ত হয়। এইসব অনিশ্চয়তা ও ডামাডোলে সুবিধাভোগী ও বঞ্চিত, উভয়েই এর পিছনে ভাগ্যের ভূমিকাকে খুঁজে পায়। যে গোষ্ঠীর মধ্যে অনিশ্চয়তা বেশি, ভাগ্যের উপর নির্ভরশীলতাও তাদের বেশি। শিল্পী, সাহিত্যিক, খেলোয়াড়, আইনজীবী ইত্যাদির মধ্যে পেশাগত অনিশ্চয়তা বেশি বলে এঁদের মধ্যে ভাগ্য - নির্ভরতাও বেশি। তাদের হাতে গ্রহরত্নের উপস্থিতিই এই কথার সত্যতা প্রমাণ করে। আমাদের দেশে অনিশ্চয়তা, সামাজিক ন্যায়নীতির অভাব, অসাম্য, বঞ্চনা ইত্যাদি উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে, ফলে ভাগ্য নির্ভরতাও বেড়েছে। এই সঙ্গে রাষ্ট্রশক্তিও চায় না বঞ্চিত মানুষের দল জানুক তাদের প্রতিটি বঞ্চনার পিছনে রয়েছে কিছু মানুষ, আকাশের গ্রহ বা স্বর্গের দেবতা নয়। ভাগ্যকে বঞ্চনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারলে প্রতিবাদের কন্ঠকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে স্তব্ধ করে রেখে বঞ্চনা ও শোষণের গতি অব্যাহত রাখা যায়। তাই রাষ্ট্রশক্তি ও শোষকশ্রেনি নানাভাবে সচেষ্ট রয়েছে ভাগ্যবিশ্বাস ও জ্যোতিষবিশ্বাসকে পালন করতে, পুষ্ট করতে। পরিবেশগতভাবেও জ্যোতিষে বিশ্বাস আমাদের চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। জ্ঞান হওয়া থেকে মা-বাবা, আত্মীয়, বন্ধু, শিক্ষক প্রত্যেকের একান্ত জ্যোতিষে-বিশ্বাস আমাদের প্রভাবিত করেই চলে। এই প্রভাব অনেক সময় এতই দৃঢ়বদ্ধ হয় যে, বিজ্ঞানে পড়াশুনো করলেও, বিজ্ঞানকে পেশা হিসেবে নিলেও বিজ্ঞানের যুক্তিগুলোকে নিজেদের জীবনচর্চায় আমরা গ্রহণ করি না। বিজ্ঞান পেশা প্রায়শই আমাদের কাছে আলুর কারবারি, জমির দালালির মতই একটা পেশা মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। আমাদের দেশের জ্যোতিষ-বিশ্বাসের নানা কারণের মধ্যে একটি প্রধান কারণ প্রত্যক্ষদর্শী প্রাচুর্য। আমরা চমক লাগানো ঘটনার গল্প বলতে ভালবাসি। পরের মুখে শোনা চমক লাগানো ঘটনাকে নিজের চোখে দেখা বলতে ভালবাসি। বিশিষ্ট মানুষদের বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে জড়িত করে প্রচার করতে ভালবাসি। বিশিষ্ট মানুষদের সঙ্গে তেমনভাবে পরিচিত না হয়েও তাদের সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত, এ কথা প্রমাণ করতে গল্প ফাঁদি। পরিচিত মানুষদের চমকে দিতে আমরা অনেক সময় সৃষ্টি করি অতিরঞ্জিত কাহিনী। আবার অনেক সময় কোনও না ঘটা ঘটনা বহুকথিত হওয়ার ফলে আমরা বিশ্বাসও করে ফেলি। আমাদের সেই বিশ্বাসকে অন্যদের মধ্যে সংক্রামিত করতে ভালবাসি বলে প্রয়োজনে নিজেকে প্রত্যক্ষদর্শী বলে বর্ণনা করি। এখনও জাদুসম্রাট পি.সি. সরকারের ঘড়ির সময় পাল্টে ফেলার অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎ মেলে। আর এইসব সাক্ষীরা আমাদেরই আপনজন, আমাদেরই মা,বাবা, জ্যেষ্ঠা, কাকা, মামা, মাসি ইত্যাদি। আমরা স্বাভাবিকভাবেই ভাবতে ভালবাসি না, আমাদের এই এই শ্রদ্ধেয় মানুষরা মিথ্যাশ্রয়ী। অথচ এটাও বাস্তব সত্য, জাদুসম্রাট পি.সি. সরকার কোনও দিনই এই ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে দেখাননি। দেখানো সম্ভব ছিল না। অনেকেই প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে যখন মা-বাবার মতো পরম শ্রদ্ধেয়দের নাম উচ্চারণ করেন, তখন বলেন, "আমার মা-বাবা কি তবে মিথ্যে কথা বলছেন? তাঁরা কি মিথ্যেবাদী? এমন মিথ্যেকথা বলার পিছনে তাঁদের কী স্বার্থ থাকতে পারে? "ইত্যাদি ইত্যাদি। এই পরিস্থিতিতে একজন যুক্তিবাদী অথবা ঠোঁটকাটা মানুষও যথেষ্ট অস্বস্তিতে পড়েন। তাঁরা সাধারণত পরিচিত মানুষটির এই প্রশ্নের উত্তরে রূঢ় সত্য কথা বলে সুসম্পর্ক নষ্ট করতে চান না। প্রশ্নকর্তা কিন্তু সেই সময় একবারের জন্যেও ভাবেন না, ★মিথ্যাচারীরাও কারো না কারো মা-বাবা, পরমাত্মীয় বা বন্ধু।★ অতএব যারা নিজেদের প্রত্যক্ষদর্শী বলে দাবি করছেন, প্রমাণহীন তাদের দাবি বা সাক্ষ্য কখনই জ্যোতিষশাস্ত্রের অভ্রান্ততার প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হতে পারে না। 'সংখ্যাগুরুর মতামত' শুধুমাত্র এই কারণে কোনও কিছু গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে না। আমরা বহু সংখ্যাগুরুর মতামত বারবার বাতিল হতে দেখেছি। বিজ্ঞানের কাছে, যুক্তির কাছে, সত্যের কাছে। পৃথিবীর চারপাশে সূর্য ঘুরছে, এটাও টো একসময় পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বিশ্বাস করত। এবং সময়ে সেই বিশ্বাস বাতিলও হল।(সম্পূর্ণ লেখাটির কিছু অংশ বাদ দিয়ে লেখাটি পোস্ট করা হল।

★যুক্তি★বারো★ প্রতিটি মানুষের হাতের রেখা আঙুলের ছাপ ভিন্নতর। তাই আজও আঙুলের ছাপ, হাতের ছাপ দেখে অপরাধী চিহ্নিতকরণের কাজ সম্পন্ন করে চলেছে অপরাধ বিজ্ঞান। একটি মানুষের ভাগ্যের সঙ্গে আর একটি মানুষের ভাগ্য কখনই পরিপূর্ণভাবে এক নয়, তা সে একই সময় জন্মালেও আর তাই দুটি মানুষের ভাগ্য কখনই পরিপূর্ণভাবে এক নয়। এই দু'য়ের সম্পর্কই প্রমাণ করে হস্তরেখার মধ্যেই সাংকেতিক চিহ্নে লিখিত রয়েছে মানুষের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত। এই সংকেত উদ্ধার একদিনে সম্ভব হয়নি হাজার হাজার বছর ধরে শত -শহস্র হস্তরেখাবিদদের পরীক্ষা পর্যবেক্ষণের মধ্যদিয়ে গড়ে উঠেছে হস্তরেখা-বিদ্যা। পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণের মধ্যদিয়ে গড়ে ওঠা এই সিদ্ধান্ত তাই বিজ্ঞান।

★বিরুদ্ধ যুক্তি★ অনেক হস্তরেখাবিদের অনেক ভবিষ্যদ্বাণী মিলে গেছে, শুধুমাত্র এই যুক্তিতে জ্যোতিষশাস্ত্রকে বিজ্ঞান বলে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ অনেক হস্তরেখাবিদের অনেক ভবিষ্যদ্বাণী মেলেনি, এটাও কিন্তু বাস্তব সত্য। কেন মেলে, কেন মেলে না সে কথা আগেই আলোচনা করেছি। তাই সে আলোচনায় আবার ফিরে আসার প্রয়োজন দেখি না। বরং আমরা এখন আলোচনা করব হাতের রেখা, ত্রিকোনাকারের রেখা, চতুষ্কোণের মত রেখা, ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে। চোখের সামনে নিজের হাতটা মেলে ধরলেই দেখতে পাব তিনটি - স্পষ্ট মোটা রেখা এবং তা ছাড়াও অনেক ছোট, বড়, সূক্ষ্ম, স্পষ্ট বহু রেখা। রেখা দিয়ে তৈরি অনেক চিহ্নও চোখে পড়তে পারে। এ-গুলো কোনও দুটি রেখার কাটা-কুটি, বহু রেখার কাটা-কুটি, বৃত্তাকারের রেখা, ত্রিকোনাকারের রেখা, চতুষ্কোণের মত রেখা, ইত্যাদি। এ-ছাড়াও প্রতিটি আঙুলের ভাঁজের তিনটি স্থানে থাকে এক বা একাধিক স্পষ্ট মোটা রেখা। মোটা দাগের রেখাগুলোকে বলা হয় ভাঁজ crease । সূক্ষ্ম রেখাগুলোকে বলা হয় ridge। ভাঁজ বা crease আমরা দেখতে পাব প্রতিটি আঙুলের ভাঁজের জায়গায় এবং হাতের তালুর তিনটি স্থানে। হাতের তালুর এই ভাঁজগুলোকে হস্তরেখাবিদরা বলেন হৃদয়রেখা (heart-line), এবং আয়ুরেখা (life - line)। হাতের ভাঁজ ও রেখাগুলো তৈরি হওয়ার কারণ শিশু গর্ভে থাকাকালীন হাতদুটি মুঠিবদ্ধ করে রাখে। ফলে হাতের তালুতে আঙুলের ভাঁজে বেশি কুঁচকে থাকা জায়গাগুলোতে তৈরি হয় ভাঁজ এবং কম কুঁচকে থাকা জায়গাগুলোতে তৈরি হয় রেখা। শিশুরা কেন এমনটা হাত মুঠোবন্দী করে রাখে? এই প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে নৃতত্ত্ববিদদের ধারণা পূর্বপুরুষদের গাছের ডাল মুঠিবদ্ধ করে ধরে রাখার অভ্যেসটাই বংশগতি সূত্রে চলে আসছে। হাত ও আঙুলের ভাঁজগুলো আমাদের হাতের নড়াচড়ায়, আঙুল চালনায় সাহায্য করে। নৃবিজ্ঞানী (anthropologist) দের মতে তালুর প্রধান তিনটি ভাঁজ আমাদের আঙুলগুলোকে চালনা করতে সাহায্য করে। আপনার বুড়ো আঙুলটি চালিয়ে দেখুন, দেখবেন আয়ুরেখাটিও চালিত হচ্ছে। ★★★জন্ম থেকেই যারা বুড়ো আঙুল ছাড়াই জন্মায় তারা আয়ুরেখা ছাড়াই জন্মায়। আয়ুরেখাই যদি জাতকের আয়ুর মাপকাঠি হয়, তবে আয়ুরেখা ছাড়া এইসব জাতক জীবনধারণ করে কী করে? ★★★ ---এর দ্বারা স্পষ্টতই প্রমাণিত হয়, আয়ুরেখা আদৌ আয়ুর পরিমাপক নয়, বুড়ো আঙুল চালনার ক্ষেত্রে সহায়ক মাত্র। ১৯৮৭ - র নভেম্বর থেকে ১৯৮৮ - র জানুয়ারি পর্যন্ত কলকাতার চারটি হাসপাতালে একটি সমীক্ষা চালানো হয় ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির উদ্যোগে। ★★★জন্মকালীন, জন্মের আগে, অথবা জন্মের অল্পসময়ের মধ্যে মারা যাওয়া একশটি শিশুর ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গিয়েছিল, ওদের প্রত্যেকেরই আয়ুরেখা ছিল। আয়ুরেখা থাকা সত্ত্বেও ওদের আয়ু কেন শুন্য? কী জবাব দেবেন জ্যোতিষীরা?★★★ জ্যোতিষীরা এই ধরনের সমীক্ষা চালালে আমার বক্তব্যের সত্যতা এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের অসারতার প্রত্যক্ষ প্রমাণ অবশ্যই পাবেন। বয়স বাড়লেও হাতের তালু ও আঙুলের ভাঁজগুলো পাল্টায় না।তবে অনেক রেখা ও চিহ্ন পাল্টে যায়, এমন কি মুছেও যায় অনেক সময়। হাতের তালুর চামড়ার নীচের মাংসপেশিগুলোর সংকোচন - প্রসারণের ফলেই রেখার এই ধরনের পরিবর্তন, সৃষ্টি বা বিলোপ ঘটে থাকে। এই পেশী সংকোচন আবার ব্যক্তির জীবনযাত্রা প্রণালীর ওপরও সাধারণ ভাবে নির্ভরশীল। শাবল - কোদাল - হাতুড়ি চালানো হাতে রেখার সংখ্যা খুবই কম। রেখাগুলো মানুষের ভাগ্য নির্দেশক নয়।

এর পরও যদি কোনও জ্যোতিষী গো ধরে বলতেই থাকেন --"হাতের রেখা নির্ধারিত ভাগ্যের নির্দেশক ", তবে তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তিবাদীদের সবচেয়ে জোরাল প্রশ্ন হল - যে হাতের রেখা দেখে জ্যোতিষী জাতকের পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য জানতে পারে, সেই হাতের রেখা পাল্টে গেলে পূর্বনির্ধারিত ভাগ্যই তো ওলট-পালট হয়ে যাবে। আর সেই সঙ্গে জাতকের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েক হাজার মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েক হাজার গুণিতক কয়েক হাজার অর্থাৎ কয়েক নিযুত সংখ্যক মানুষের ভাগ্যের পূর্বনির্ধারিত ঘটনা যাবে পাল্টে। ওই নিযুত সংখ্যক মানুষের ভাগ্য পাল্টে গেলে তার প্রভাব পড়বে কয়েক নিযুত গুণিতক কয়েক নিযুত মানুষের ভাগ্যে। এই ভাগ্য পরিবর্তন চলতেই থাকবে এই ধরনের গুণিতকের নিয়মেই। ★★★ ভাগ্য বাস্তবিকই নির্ধারিত হল এবং এক-ই সঙ্গে পাথর তাবিজ পরে হাতের রেখা পাল্টে দিলে মহা গন্ডোগোল।★★★ একটি জাতকের ভাগ্যের সামান্যতম পরিবর্তন পৃথিবীর মানুষদের নির্ধারিত ভাগ্যের ভারসাম্যকে ওলট-পালট করে দিতে বাধ্য। হাতের রেখা যেহেতু বহু মানুষেরই পাল্টায়, তাই 'হস্তরেখা শাস্ত্রটি বিজ্ঞান' এই দাবি মূর্খতা বা শঠতারই নির্দেশক।

★যুক্তি★তেরো★ কোনও বিষয়ের পরীক্ষা গ্রহণের তিনিই শুধু অধিকারী হতে পারেন, যিনি সেই বিষয়ে সুপন্ডিত। পদার্থবিদ্যার পরীক্ষা নিতে পারেন শুধুমাত্র একজন পদার্থবিদ্যায় পন্ডিত মানুষ। একজন রসায়নবিদ কী পারেন পদার্থবিদ্যার পরীক্ষা নিতে? না, পারেন না। এই একই যুক্তিতে জ্যোতিষশাস্ত্রের পরীক্ষা তারাই নিতে পারেন, যাঁরা জ্যোতিষ-শাস্ত্রে সুপন্ডিত। আজকাল এক নতুন বিপত্তি দেখা দিয়েছে নব্য কিছু যুক্তিবাদীদের নিয়ে। তারা যেখানে-সেখানে আমাদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলছে -"কয়েকজনের জন্ম সময় বা হাত দেখতে দিচ্ছি,সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করলে স্বীকার করে নেব জ্যোতিষশাস্ত্র বিজ্ঞান।" ওইসব যুক্তিবাদীদের স্বীকার বা অস্বীকারের ওপর জ্যোতিষশাস্ত্র বিজ্ঞান কী, বিজ্ঞান নয় -- তার মীমাংসা নির্ভর করে না। জ্যোতিষশাস্ত্রকে এভাবে পরীক্ষা করতে চাওয়ার কোনও অধিকারই যুক্তিবাদীদের নেই। আবারও বলি অতি যুক্তিসংগতভাবেই জ্যোতিষশাস্ত্রের অভ্রান্ততা পরীক্ষার একমাত্র অধিকারী জ্যোতিষীরাই।

★বিরুদ্ধ যুক্তি ★ বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বিস্তার লাভ করেছে বিজ্ঞানের বহু শাখা-প্রশাখা। মহাকাশবিজ্ঞানী, রকেটবিজ্ঞানী, কম্পিউটারবিজ্ঞানী, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, প্রত্যেকেই তাঁর শাখার বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী বলে সেই বিষয়ে পরীক্ষা গ্রহণের অধিকারী হলেও, অন্য শাখায় বিশেষ জ্ঞান না রাখলে সেই শাখার পরীক্ষক হিসেবে অচল, এটা অতি সাধারণ যুক্তিতেই বোঝা যায়। এই যুক্তির ওপর নির্ভর করে জ্যোতিষীরা দাবি রেখেছেন, জ্যোতিষশাস্ত্রের পরীক্ষা নেওয়ার একমাত্র অধিকারী জ্যোতিষীরাই ; অন্য কেউ নয়। বেশ সুন্দর যুক্তি। এই যুক্তির ওপর নির্ভর করে অলৌকিক ক্ষমতার দাবিদারও নিশ্চই দাবি তুলতে পারে, তাদের অলৌকিক ক্ষমতা আছে কি না, এ পরীক্ষা গ্রহণের অধিকার শুধুমাত্র অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারীদেরই। অলৌকিক ক্ষমতাও আবার নানা ধরনের ; কেউ শূন্যে ভাসে, কেউ শূন্য থেকে বস্তু সৃষ্টি করে, কেউ জলে হাঁটে, কেউ মৃতে প্রাণ দান করে, কেউ রোগ মুক্ত করে, কেউ অলৌকিক দৃষ্টিতে সবকিছুই দেখতে পায় দৃশ্য-অদৃশ্য, ভূত-ভবিষ্যৎ সবই। এমনি নানা অলৌকিকক্ষমতার কোনও সীমা পরিসীমা নেই।অলৌকিক ক্ষমতায় শূন্যে ভেসে থাকার দাবিদার এই একই যুক্তি বলতেই পারেন - "শূন্যে ভাসার ক্ষমতা আছে কিনা, তা আমরা সাধারণ মানুষকে দেখাব না, তারা পরীক্ষা নেবার কে? আমার শূন্যে ভাসার ক্ষমতার পরীক্ষা নেবার অধিকারী একমাত্র সেই, যে শূন্যে ভাসতে পারে। " একই ভাবে মৃতকে প্রাণ-দান করার ক্ষমতার অধিকারী দাবি করে বসবে --"বাসি মরাকে যদি আমি বাঁচিয়ে তুলিও, তোমরা কী করে বুঝবে ওকে বাঁচিয়েছি? তোমরা বলার কে--'মরাটাকে বাঁচিয়ে দেখিয়ে দাও তোমার অলৌকিক ক্ষমতা।' আমার এই ক্ষমতা যে আছে সে শুধু বুঝতে পারবে তারাই, যারা মন্ত্রে মরা বাঁচায়। " তারপর কোনও এক বাবা এসে হেঁকে বসবে, "আমি শূন্য থেকে সৃষ্টি করতে পারি গোটা একটা জাম্বো জেট প্লেন। "সেই সময় কোনও মানুষ আহম্মকের মত যদি বলে বসে, "করুন তো, করুন তো! " তখন ওই বাবা মৃদু হেসে যদি বলে বসে, "বৎস আমি এখুনি এই মাঠটায় একটি বিশাল জাম্বো জেট প্লেন তৈরি করে হাজির করলেও তোমরা কি করে বুঝবে যে আমি সত্যিই একটা পেল্লাই এরোপ্লেন তৈরি করেছি? এটা তোমাদের বোঝার কম্মো নয়। বুঝবে শুধু তারাই, যারা আমারই মত মন্তরে প্লেন তৈরি করতে পারে "। শুনে মানুষটি নিশ্চয়ই বলবে, "বাবাজি ব্যাটা হয় পাগল, নয় বুজরুক। " কিন্তু ওই বাবার ওই কথা শুনে জ্যোতিষী কী বলবে? জানার ইচ্ছে রইল।

★যুক্তি চোদ্দো★ বর্তমানে সর্বস্তরের মানুষের মনে জ্যোতিষ যেভাবে শিকড় গেড়ে বসেছে --এই শাস্ত্র মিথ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হলে, নিশ্চয়ই তা সম্ভব হত না।" এই কথাগুলো তুললাম প্রচারে বিশাল কোনও একজন জ্যোতিষীর দেওয়া দৈনিক পত্রিকায় পুরো পাতা জোড়া বিজ্ঞাপন থেকে।

★বিরুদ্ধ যুক্তি★ সংখ্যাধিক্যের ব্যক্তি-বিশ্বাসের সঙ্গে বিজ্ঞানের সত্যের সম্পর্ক কোথায়? বিজ্ঞানের দরবারে সংখ্যাধিক্যের অন্ধ-বিশ্বাসের দাম এক কানা-কড়িও নয়। হাজার হাজার বছর ধরে সংখ্যাধিক মানুষ বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীকে ঘিরেই ঘুরে চলেছে সূর্য। "বেশিরভাগ মানুষ যেহেতু বিশ্বাস করেন, অতএব এই তথ্য মিথ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না"--এই কুযুক্তিকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত - 'সূর্যকে ঘিরেই পৃথিবী ঘুরছে', সংখ্যাধিক্যের যুক্তিহীন বহু বিশ্বাসই এমনি ভাবে মিথ্যে প্রতিপন্ন হয়েছে। এমন উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে বহু, তার থেকেই একটিকে তুলে দিলাম মাত্র। আর একটি উদাহরণ অবশ্যই -- জ্যোতিষশাস্ত্র। অজ্ঞানতা ও যুক্তিহীনতার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকা এই শাস্ত্রের শেষ স্থান ডাস্টবিনে। সাধারণের মধ্যে চেতনার উন্মেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্যোতিষশাস্ত্রে আঁধার নামতে বাধ্য। সাধারণের মধ্যে চেতনার উন্মেষের পথ চিরকালের জন্য রুদ্ধ রাখা কখনই সম্ভব নয়, কারণ মানব প্রজাতির সামগ্রিক অগ্রগতি প্রমাণ করে -- চেতনার জয়যাত্রা চলেছে।

★যুক্তি পনেরো★ রাশিচক্রের ব্যাপারটা যদি বিজ্ঞান না হয়, তবে রাশিচক্র দেখে জ্যোতিষীরা কি করে জাতকের জন্মমাস, জন্ম সময়, এমনকি জন্মসাল পর্যন্ত বলে দেন?

★বিরুদ্ধ যুক্তি★ রাশিচক্রে রবি কোন রাশিতে আছে দেখে জন্মমাস বলা যায়, যেহেতু কোন মাসে জন্ম হলে রবিকে কোন ঘরে বসানো হবে, তা জ্যোতিষশাস্ত্রে আগেই নির্দেশ দেওয়া আছে। দিন-রাতের চব্বিশ ঘন্টাকে বারোটি ভাগে ভাগ করে জ্যোতিষশাস্ত্রে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে কোন সময়ে জন্ম হলে কোন ঘরে লগ্ন ধরা হবে। সুতরাং লগ্ন দেখে জন্ম সময় অনুমান করাটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। ধরুন আমরা একটা নতুন শাস্ত্র তৈরি করলাম, নাম দিলাম 'অ-জ্যোতিষশাস্ত্র'। তাতে জাতকের জন্ম সময় অনুসারে তৈরি করা হল 'রবিচক্র'। রবিচক্রে ঘর করা হল বাহান্নটি। শাস্ত্রে নির্দেশ দিলাম - বছরের কোন সপ্তাহে জাতক জন্মালে রবিকে কোন ঘরে বসানো হবে। তখন এই অজ্যোতিষী জাতকের সূর্যচক্রে সূর্য কোথায় অবস্থান করছে দেখে বলে দিতে সক্ষম হবে, জাতকের জন্ম কোন মাসের কোন সপ্তাহে। আর রবিচক্রে ৩৬৬ টি ঘর রেখে লিপিয়ার ছাড়া ৩৬৫ টি ঘর যদি ব্যাবহার করি এবং বছরের কোন দিনটিতে জন্ম হলে সূর্যের অবস্থান কোন ঘরে থাকবে, অ-জ্যোতিষশাস্ত্রে তার নির্দেশ দেওয়া থাকলে, সেই সূত্রের সাহায্যেই বলে দেওয়া সম্ভব -- জাতক কোন মাসের কোন তারিখে জন্মেছে। এই পদ্ধতিতে অজ্যোতিষশাস্ত্র - লগ্ন কোন রাশিতে আছে দেখে অবশ্যই বলে দিতে পারবে ঠিক কতটা বেজে কত ঘন্টা, কত মিনিটে জাতক জন্মেছে। তার জন্যে আমরা অ-জ্যোতিষশাস্ত্রে রাখব আলাদা একটা লগ্ন চক্রের ব্যাবস্থা। লগ্নচক্রে থাকবে ১৪৪০ ঘর। অর্থাৎ সারা দিন রাতকে প্রতিটি মিনিটে ভাগ করে ফেলব। এইভাবে 'রবিচক্র' বা 'লগ্নচক্র' দেখে জাতক কোন তারিখে কতটা বেজে কত মিনিটে জন্মেছে বলে দেওয়া অবশ্যই সম্ভব হবে। কিন্তু বলতে পারার জন্য কখনই 'অজ্যোতিষশাস্ত্র' বিজ্ঞান হয়ে দাঁড়াবে না।

★যুক্তি সতেরো★আমরা পৃথিবীর ক'জন দেখেছি নিজের প্রপিতামহকে? দেখিনি। তবু আমরা প্রপিতামহের নামটি তো বলি। এ কি বিশ্বাসের উদাহরণ নয়?

★আমাদের পিতার নাম জিজ্ঞেস করলে মায়ের বিবাহিত স্বামীর নামই উল্লেখ করি। তিনিই যে আমাদের জন্মদাতা, তার প্রমাণ কী? এখানেও তো আমরা বিশ্বাসকেই আঁকড়ে ধরি।★ আমরা বায়ু চোখে দেখি না, তারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বিদ্যুৎ দেখতে পাই না, দেখতে পাই না শব্দতরঙ্গ, তবু এ-সবের অস্তিত্বে বিশ্বাসী। আমরা আকবরকে দেখিনি, গৌতমবুদ্ধকে দেখিনি। কোনও চাক্ষুষ প্রমাণ ছাড়া এমনই হাজারো বিষয়কে আমরা যখন মেনে নিচ্ছি শুধুমাত্র বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে, তখন জ্যোতিষশাস্ত্রের ক্ষেত্রে কোন যুক্তিতে আমরা বিশ্বাসের ওপর নির্ভরতার বিরোধিতা করে প্রমাণ হাজির করতে বলব?

★বিরুদ্ধ যুক্তি★ যুক্তিগুলো আপাত জোরাল মনে হলেও, বাস্তবিকপক্ষে এগুলো কোনও যুক্তিই নয়। কেন নয়? এই প্রশ্নের আলোচনাতেই এবার ঢুকছি। প্রাচীন যুগ থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি পন্ডিত মহল প্রত্যক্ষ প্রমাণকে শ্রেষ্ঠ বললেও প্রত্যক্ষ অনুগামী প্রমাণকে অবশ্যই স্বীকার করে নিয়েছেন। 'চড়ক সংহিতা'য় প্রত্যক্ষ অনুগামী তিন প্রকারের অনুমানের কথা বলা হয়েছে (১) বর্তমান ধূম দেখে বর্তমান অগ্নির অনুমান। (২) বর্তমান গর্ভবতী মহিলা দেখে তার অতীত মৈথুনের অনুমান। (৩) বর্তমান সুপুষ্ট বীজ দেখে ভবিষ্যৎ বৃক্ষ ও ফলের অনুমান। এক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি আগের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই বিভিন্ন অনুমানের কথা বলা হয়েছে ; অনুমানগুলো বর্তমান দেখে বর্তমান, বর্তমান দেখে অতীত এবং বর্তমান দেখে ভবিষ্যৎ বিষয়ক। এই নিয়মে এখনও আমরা পূর্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে বর্তমান, অতীত এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয়ে অনুমান ও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি। আমার অস্তিত্ব থেকেই সিদ্ধান্ত নিতে পারি, আমার প্রপিতামহের অস্তিত্ব ছাড়া পিতার অস্তিত্ব সম্ভব নয়। একই ভাবে পিতার অস্তিত্ব ছাড়া আমার অস্তিত্ব সম্ভব নয়। ★আমার জন্মদাতাই যে মায়ের স্বামী, এমটা হতে পারে, নাও হতে পারে। প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রেই এই সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। কিন্তু বর্তমান সমাজের প্রচলিত রীতি অনুসারে আমরা সাধারণভাবে মা'য়ের বিবাহিত স্বামীকে 'পিতা' বলে পরিচয় দিয়ে থাকি। এটা রীতির প্রশ্ন, প্রমাণের প্রশ্ন নয়। আমরা বায়ুকে চোখে না দেখলেও অনুভব করতে পারি, ওজন নিতে পারি, বায়ুর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উইন্ডমিল চালাতে পারি। আরও বহু ভাবেই আমরা বায়ুর অস্তিত্বের প্রমাণ পাই। আমরা জল, কয়লা, ডিজেল, ব্যাটারি, পরমাণু শক্তি ইত্যাদিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর সেই বিদ্যুৎ তারের মাধ্যমে পাঠানোর সময় নিশ্চয় দেখা যায় না, কিন্তু বিদ্যুৎচালিত আলো বা যন্ত্র থেকেই সিদ্ধান্তে পৌঁছই--বিদ্যুৎশক্তির উপস্থিতির। এইভাবে বিজ্ঞান শব্দতরঙ্গের অস্তিত্বও প্রমাণ করেছে। বুদ্ধের মূর্তি, শিলালিপি, আকবরের বিভিন্ন দলিলের বর্তমান অস্তিত্বের ওপর নির্ভর করেই আমরা তাঁদের অতীত অস্তিত্ব অনুমান করতে পারি। কিন্তু এমন ধরনের কোনও প্রমাণই আমাদের সামনে জ্যোতিষীরা হাজির করতে পারেননি, যার দ্বারা আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি -- মানুষের ভাগ্য পূর্বনির্ধারিত এবং গ্রহ-নক্ষত্রই মানুষের ভাগ্যকে পূর্বনির্ধারিত করেছে এবং জ্যোতিষ-শাস্ত্রের সাহায্যে সেই পূর্বনির্ধারিত ভাগ্যকে জানা সম্ভব।

★যুক্তি আঠেরো★ কিছু নামী-দামি জ্যোতিষী বর্তমানে জ্যোতিষশাস্ত্রের পক্ষে একটি যুক্তির অবতারণা করতে শুরু করেছেন। তাঁরা কিছু জ্যোতিষ - সম্মেলনেও এই যুক্তির অবতারণা করেছেন। 'জ্যোতিষবিজ্ঞান - কথা' গ্রন্থেও যুক্তিটি জোরালভাবে রাখা হয়েছে। যুক্তিটি হল এই - "আইনশাস্ত্রকে আমরা বিজ্ঞান না বললেও এই শাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা সর্বদেশেই স্বীকৃত। "..."জ্যোতিষীরাও তাঁদের শাস্ত্র সম্বন্ধে একই মনোভাব পোষণ করেন। কিন্তু তাদের প্রশ্ন, যদি বিচার ব্যাবস্থা স্বীকৃতিলাভের যোগ্য হয়ে থাকে তবে তাদের জ্যোতিষশাস্ত্র স্বীকৃতি পাবে না কেন?

★বিরুদ্ধ যুক্তি★ জ্যোতিষীরা এই যুক্তির অবতারণা করে কি তবে শেষ পর্যন্ত এ-কথাই স্বীকার করছেন না যে--আইনশাস্ত্র যেমন বিজ্ঞান নয়, জ্যোতিষশাস্ত্রও তেমনই বিজ্ঞান নয়। জ্যোতিষশাস্ত্র বিজ্ঞান বলে প্রমাণ করার চেষ্টাকে মুলতুবি রেখে, জ্যোতিষশাস্ত্র অ-বিজ্ঞান বলে স্বীকার করে নেওয়ার পরই দাবি করা হয়েছে আইন বিজ্ঞান না হয়েও যদি স্বীকৃতি লাভ করে থাকে, তবে জ্যোতিষশাস্ত্রকে স্বীকার করা হবে না কেন? "বিজ্ঞান নয় এমন অনেক কিছুই মানুষের স্বীকৃতি পেয়েছে। স্বীকৃতি পেয়েছে সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, নাটক। স্বীকৃতি পেয়েছে বুককার পোলভল্টের অসাধারণ প্রতিভা, মারাদোনার ফুটবল খেলার নৈপুণ্য, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য প্রতিভা, মহম্মদ আলির বক্সিং প্রতিভা। এ-সবই স্থূল অর্থে বিজ্ঞান না হয়েও যদি স্বীকৃতি পেতে পারে, তবে জ্যোতিষশাস্ত্রের ক্ষেত্রে কেন বিজ্ঞান না হওয়া অজুহাত দেখিয়ে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না?" এ এক বিচিত্র অভিযোগ। সব কিছুরই স্বীকৃতি লাভের পেছনে কিছু নিয়ম-কানুন ও কিছু যুক্তি থাকে। একজন মানুষ গুন্ডা বা মস্তান হিসেবে স্বীকৃতি পায় গুন্ডামি বা মস্তানি করে।

★একজন সিনেমার টিকিটব্ল্যাকার হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে সিনেমার টিকিট ব্ল্যাক করে। একজন রাজনীতিক স্বীকৃতি পায় রাজনীতি করার মধ্য দিয়েই। একজন সাহিত্যিক হিসেবে স্বীকৃতির অধিকার তখনই যখন সে সাহিত্য সৃষ্টি করে। একজন মানুষ ভবিষ্যৎবক্তা হিসেবেই তখনই স্বীকৃতি পেতে পারে, যখন সে ভবিষ্যৎ বলতে পারবে।★ ভবিষ্যৎবক্তা বা জ্যোতিষীদের স্বীকৃতির ওপরই নির্ভর করে রয়েছে জ্যোতিষশাস্ত্র। জ্যোতিষীদের ক্ষমতা প্রমাণিত হলে তাঁরা যে শাস্ত্রের সাহায্যে গণনা করছেন, সেই শাস্ত্রও অবশ্যই স্বীকৃতিলাভ করবে। নতুবা জ্যোতিষশাস্ত্র শুধুমাত্র পরধন-লুন্ঠনকারী প্রতারকদের শাস্ত্র হিসেবেই স্বীকৃত হবে।

★যুক্তি উনিশ★ অজ্ঞতা ও অন্ধতা থেকে যারা জ্যোতিষশাস্ত্রের অযথা নিন্দা করার সাহস পায়, তাদের যদি রবীন্দ্রনাথ পড়া থাকত তাহলে অন্যায় দোষারোপ করার আগে মনে পড়ত রবীন্দ্রনাথের কথা -- "পৃথীবিতে কতকিছু তুমি জানো না, তাই বলে সে সব নেই? কতটুকু জানো? জানাটা এতটুকু, না জানাটাই অসীম। সেই এতটুকুর উপর নির্ভর করে চোখ বন্ধ করে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া চলে না। আর তাছাড়া এত লোক দল বেধে ক্রমাগত মিছে কথা বলবে, এ আমি মনে করতে পারিনে। তবে অনেক গোলমাল হয় বই কি?" এক জ্যোতিষসম্রাটের লেখা একটি বহু বিজ্ঞাপিত বই থেকে এই অংশটা তুলে দিলাম।

★বিরুদ্ধ যুক্তি★ যুক্তিটা এই রকম -- "যারা জ্যোতিষশাস্ত্রের নিন্দা করে তারা না জেনেই করে, অজ্ঞতা থেকেই করে। আর, অজ্ঞতা সমস্ত মানুষের ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক। পৃথীবিতে এমন কোনও মানুষ নেই যে সর্ব বিষয়ে বিজ্ঞ। না জানা বিষয়ে মুখ ঘুরিয়ে থাকাটা উচিত নয়। না জানা বিষয়কে অস্বীকার করা উচিত নয়। জ্যোতিষশাস্ত্রের অস্তিত্বকে মুহূর্তে উড়িয়ে দেওয়াটা ঠিক নয়। " এই ধরনের যুক্তির সাহায্যে যে কোন অস্তিত্বহীনের অস্তিত্বই কিন্তু প্রমাণ করা সম্ভব। যেমন ধরুন আমি যদি বলি যে, আকাশ থেকে মাঝে মাঝে এক ধরনের ডিম বৃষ্টি হয় কোথাও কোথাও। ডিমগুলো মাটিতে পড়ার আগেই সেগুলো ফুটে বের হয় চব্বিশ ক্যারেট সোনার দুশো গ্রাম ওজনের একটা করে জীবন্ত পাখির বাচ্চা। ওগুলো মাটিতে পড়ার আগেই উড়তে উড়তে চলে যায় কাছাকাছি কোনও সমুদ্রের দিকে। তারপর ওরা দল বেঁধে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে। আপনি কোনও ভাবেই আমার এই বক্তব্যের বিরোধিতা করতে পারছেন না। কারণ বিরোধিতা করতে গেলেই বলব, "পৃথিবীর কতটুকু আপনি জানেন? এই ধরনের পাখির অস্তিত্ব বিষয়ে আপনার জানা নেই বলে এর অস্তিত্বকে আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। " এখানে আমি আপনার কাছে যে যুক্তি হাজির করেছি তার মধ্যে রয়েছে প্রতারণামূলক যুক্তি বা fallacy । আসুন আমরা একটু দেখি এই প্রতারণামূলক যুক্তির প্রতারণার অংশটুকু কোথায় লুকোন রয়েছে। বৈজ্ঞানিক বা যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত আসে পরীক্ষা - পর্যবেক্ষণ এবং শৃঙ্খলিত জ্ঞান ইত্যাদি অনুসন্ধানের পথ ধরে। সিদ্ধান্তে পৌঁছবার জন্যে আমরা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান কখন শুরু করি? যখন কোনও ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে আমরা কিছু অনুমান বা সন্দেহ করতে শুরু করি এবং অসম্পূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও সংগৃহীত তথ্য থেকে একটি আনুমানিক সিদ্ধান্ত খাড়া করি। পরিপূর্ণ পরীক্ষা - পর্যবেক্ষণের আগের এই অনুমাননির্ভর পর্যায়কে ন্যায়শাস্ত্রে বলে প্রকল্প বা hypothesis । সোজা বাংলায় এ হলো -- "কাকে আপনার কান নিয়ে গেল" শুনে সে কথায় বিশ্বাস করে কাকের পিছনে না ছুটে নিজের কানে আগে হাত বুলিয়ে দেখা। জ্যোতিষশাস্ত্র বিজ্ঞান - কি বিজ্ঞান নয় ; সত্য, না গাঁজা - গপ্পো ; সত্য হলে শতকরা কত ভাগ সত্য ; ইত্যাদি নিয়ে ব্যাপকতর গবেষণায় লিপ্ত হওয়ার আগে আমরা logic বা ন্যায়শাস্ত্রের 'প্রকল্প' অনুসারে জ্যোতিষীদের কিছু আগাম ভবিষ্যদ্বাণী মিলিয়ে দেখে নিলেই গোল মিটে যায় । ★ভবিষ্যদ্বাণী মিলিয়ে দেখার সুযোগও যখন আছে তখন সে সুযোগ গ্রহণ না করেই জ্যোতিষশাস্ত্রের যথার্থতা নিয়ে কুট-কচকচানিতে নামা কানে হাত না দিয়েই কাকের পিছনে দৌড়নোরই নামান্তর।★ আর বিজ্ঞানের কাছে সংখ্যাধিক্যের কোনও গুরুত্ব নেই, এ-নিয়ে আগেই বিস্তৃত আলোচনায় আমরা এসেছি।

-★যুক্তি কুড়ি★ এই যে বেশ কিছু লক্ষ মানুষের মধ্যে একজন লটারিতে ফার্স্ট প্রাইজ পাচ্ছেন, ঠিক তিনিই কী করে পাচ্ছেন? এটা কি ভাগ্য নয়? বিমান দুর্ঘটনা হচ্ছে, নৌকোডুবি হচ্ছে, আরও নানা বড় আকারের দুর্ঘটনায় এই যে অনেকে মরছে, অথচ তার মধ্যেই কেউ কেউ কী করে বাঁচছে? এটা কী ভাগ্য নয়? যুক্তিবাদীরা এই বিষয়ে কোনও যুক্তি হাজির করতে পারবেন কি? ★বিরুদ্ধযুক্তি★ এমন লটারি জেতা 'ভাগ্য' বা দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পাওয়া 'ভাগ্য'-র সঙ্গে জ্যোতিষশাস্ত্রের 'ভাগ্য'-র স্পট একটা সম্পর্ক আছে। লটারি (তা সে পাড়ার ক্লাবের লটারিই হোক বা কোটি কোটি টাকা বাজেটের লটারিই হোক) হলেই তাতে একটা নম্বর প্রথম পুরস্কার দেবার জন্য তোলা হবেই। বহুর মধ্য থেকে কয়েকটি নম্বর তুলে সেইসব নম্বরের টিকিট মালিকদের পুরস্কৃত করার ওপরই লটারি ব্যাবসা দাঁড়িয়ে রয়েছে। --★প্রথম পুরস্কার এমনিই একটি তোলা নম্বর। এই তোলা টিকিটের একজন ক্রেতা থাকবেই। তাকেই দেওয়া হবে প্রথম পুরস্কারটি। এটি একটি পদ্ধতির মাধ্যমে বেরিয়ে আসা ঘটনা মাত্র। ★অর্থাৎ, মোদ্দা কথায় স্রেফ, একটি ঘটনা মাত্র। এর বেশি কিছুই নয়। যত বেশি বেশি করে নতুন নতুন লটারি ব্যাবসা - প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠবে ততই বেশি বেশি করে মানুষ এইসব লটারির পুরস্কারও পেতে থাকবে। জ্যোতিষীদের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় -- ততই বেশি বেশি করে মানুষ এমন লটারি বিজেতার 'ভাগ্য' অর্জন করবে। ★লটারি ব্যাবসা, ঘোড়-দৌড় ইত্যাদি জুয়া যতদিন থাকবে, ততদিন বিজেতাও থাকবেই।★**★আইনের খোঁচায় লটারি ব্যাবসা বন্ধ হলেই লটারি পাওয়া ভাগ্যবান সৃষ্টির ক্ষমতাও গ্রহ-নক্ষত্র বা ঈশ্বরদের লুপ্ত হয়ে যাবে। ★**আইনের কাছে ওইসব 'ভাগ্য নিয়ন্তা'দের ক্ষমতা এতই সীমাবদ্ধ। বিমান অ্যাকসিডেন্ট বা যে কোনও অ্যাকসিডেন্টের পিছনেই থাকে কিছু কারণ। বিমান তৈরির কারিগরিগত কিছু ত্রুটি বা ওই মডেলের বিমান চালনার বিষয়ে চালকের ট্রেনিংগত ত্রুটি, অথবা অন্তর্ঘাত, কিংবা দুর্যোগ, অথবা বিমান আকাশে ওড়ার আগে পরীক্ষাগত ত্রুটি ইত্যাদি এক বা একাধিক কারণ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হতেই পারে। দুর্ঘটনা হলেই সকলে মারা যাবে, এমনটা সব ক্ষেত্রেই ঘটবে ভাবার মত কোনও কারণ নেই। এ-ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ব্যাপকতার অবশ্যই একটি ভূমিকা রয়েছে। ★বিমান বিস্ফোরণে আকাশেই টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লে একজন যাত্রীকেও বাঁচাবার ক্ষমতা কোনও গ্রহ-নক্ষত্রের হবে না। দুর্ঘটনায় বিমানের কোনও একটি বিশেষ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে অংশের যাত্রীদের ক্ষতিগ্রস্ত হবার এমনকি মৃত্যু হবার সম্ভাবনাও বাড়বে। ★বিমানের কোনও অংশ কম ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা অক্ষত থাকলে, সেই অঞ্চলের যাত্রীদের ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনাও কম থাকবে। এরই পাশাপাশি দুর্ঘটনার মুহূর্তে যাত্রীর কোমরে বেল্ট বাঁধা ছিল কি না, যাত্রীর থেকে বাইরে বেরবার দরজা কতটা দূরে ছিল, যাত্রী সেই সময় কোথায় কী ভাবে অবস্থান করছিল, এবং আরও বহুতর কারণই যাত্রীর মৃত্যু হওয়া না হওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে। এবং এগুলোও নেহাতই ঘটনা বই কিছুই নয়।-নৌকোডুবি হচ্ছে ; মানুষ মরছে। নৌকোডুবির পিছনে ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস যেমন বহুক্ষেত্রেই একটি কারণ, তেমনই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষমতার বেশি যাত্রী-বহনই প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, অন্তত আমাদের দেশে। প্রশাসনের গাফিলতি, অপ্রতুল পরিবহণ ব্যাবস্থার জন্য যাত্রীরা প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়েই নৌকোয় উঠতে বাধ্য হন। অনেক সময়ই নির্ধারিত যাত্রীর দেড়-দু'গুণ যাত্রী ওই সব নৌকো বহন করে। ফলে দুর্ঘটনাও ঘটে। কেউ বাঁচেন, অনেকেই মারা যান। কিন্তু এই পরিবহনগত সমস্যা মেটাবার ব্যাবস্থা যদি প্রশাসন করে এবং শক্ত হাতে যাত্রী বহনের ক্ষেত্রে নৌকোগুলোকে আইন মানতে বাধ্য করে, তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বেশি যাত্রী বহনের জন্য নৌকোডুবিতে মারা যাওয়া ও বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর 'ভাগ্য' পাল্টে যেতে বাধ্য। তখন ওই গ্রহ-নক্ষত্রদের সাধ্য হবে না, নৌকোডুবিজনিত বাঁচা-মরা নিয়ন্ত্রণ করা। কারণ বাড়তি যাত্রীবহনের জন্য কোনও নৌকোই তখন ডুববে না। কিন্তু জ্যোতিষশাস্ত্রের 'ভাগ্য' অবশ্যই অন্য কিছু। সে ভাগ্য হঠাৎ লটারি পাওয়া বা দুর্ঘটনায় পড়ে বেঁচে থাকে বা মরে যাওয়ার একটি ঘটনা মাত্র নয়। জ্যোতিষশাস্ত্রের 'ভাগ্য' -- মানুষের পূর্বনির্ধারিত জীবন। ★জ্যোতিষশাস্ত্রের পক্ষে প্রধান যুক্তিগুলো নিয়ে আলোচনা করলাম। এর বাইরেও কিছু কিছু থেকে গিয়েছে, যেগুলো গুরুত্বহীন ও অত্যন্ত জোলো অথবা এখনও আমি সেইসব যুক্তিগুলো শুনিনি, তাই আলোচনায় আসেনি। এই আক্রমণের পর জ্যোতিষীরা নিশ্চয়ই নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকবে না। চেষ্টা করবে আবারও নতুন কোনও প্রতারণামূলক যুক্তি খুঁজে বের করতে। তেমন কোনও যুক্তি হাজির হলেও বিরুদ্ধ যুক্তি অবশ্যই হাজির করব, অঙ্গীকারবদ্ধ রইলাম। এই লেখার বাইরে জ্যোতিষীদের হাজির করা কোনও বিরুদ্ধ-যুক্তি আপনারা জানতে চাইলে নিশ্চয়ই দেব। শুধু অনুরোধ, চিঠি জবাবী খাম-সহ পাঠাবেন। লেখক-প্র★বী★র★★ঘো★ষ। বই- অলৌকিক নয়, লৌকিক(তৃতীয় খন্ড)। অষ্টম সংস্করণ। দে'জ পাবলিশিং।

If you found this article interesting, please copy the code below to your website.
x 
Share

Leave a Reply