এক এক্স-মেজরের লেখা চিঠি।


আমি কাশ্মীরে ছিলাম, না,ট্যুরিস্ট হিসেবে নয়৷ আমি সেখানে বাস করেছি ভারতের সামরিক বাহিনীর একজন অংশ হিসেবে I দায়িত্বে ছিলাম বাকি কাশ্মীরের স্বর্গের সৌন্দর্যতাকে সেখানকার অ-বাসিন্দাদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য I

২১ বছরের একজন যুবক, পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ সামরিক বাহিনীর অঙ্গ হিসেবে হাতে একে-৪৭ নিয়ে সেখানকার শহর আর গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছি, যেখানে সেখানকার বুরহান ওয়ানি বা ওয়াজির বয়সী কোন যুবকই সেই সেনাবাহিনীর অঙ্গ নয় এবং হতেও চায় না৷ অথচ সেই শহর বা গ্রাম সবকিছুই তাদের ৷
ঘটনাক্রমে, একজন নেপালের বাসিন্দা হয়ে বেশ কিছু দ্বিচারিতা নিয়েই ভারতীয় আর্মিতে কাজ করেছি বেশ কিছু সময় কাশ্মীরের মত একটা উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্টে যখনই সশস্ত্র অবস্থায় বাকিদের সাথে টহলে বেড়িয়েছি, নেপালে থাকাকালীন দিনগুলোর কথা মনে পড়েছে বারে বারে I বুঝতে পারতাম কার্ফু চলাকালীন নিজেরই বাড়িতে সন্ধ্যা ছটা থেকে সকাল ছটা অব্দি বন্দী হয়ে থাকতে,কতটা বিরক্তিকর ও অসহনীয় লাগে,তাও যখন সেটা বছরের পর বছর ঘটে চলে ৷
নেপালে মাওইস্ট অভ্যুত্থান যখন তুঙ্গে, আমি তখন কিশোর I সেনা দ্বারা অবহেলিত কাশ্মীরি যুবকদের অবস্থা আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, এমনও ঘটেছিল আমার জীবনে যখন আমি একজন পুলিশকর্মীকে অনুরোধ করেছিলাম পুনরায় তা বলতে যা তিনি আদেশ করেছিলেন, এটিই ছিল আমার দোষ I ফলস্বরূপ সেইবারের জন্য ওঠবোস করিয়ে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়৷
বাড়িতে প্রতিনিয়ত পুলিশ আসত, কখনও ইউনিফর্ম সহ বা কখনও ইঁউনিফর্ম ছাড়া I আবার পুলিশের চরও আসত তল্লাশি করতে যে আমাদের বয়সী ছেলেরা মাওবাদীদের সাথে যুক্ত হয়েছে কিনা ! আবার এমনও অজানা মানুষ এসেছে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে, সাথে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র কোন কাগজ বা কাপড়ে জড়িয়ে, শুধুমাত্র খাবার, জল বা কয়েক মুহুর্তের জন্য মাথা গোঁজার আকুতি নিয়ে।
আমার খুব রাগ হয়েছিল, যখন মাওবাদী নেতা প্রচণ্ডের ছবি দেখেছিলাম একবার সেখানকার কমরেডদের মাধ্যমে, যা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে আনা হয়েছিল। জেএনইউ এর থেকে পিএইচডি করা নেপালের তৎকালীন মাওবাদী নেতা বাবুরাম ভাট্টারির প্রচারিত আদর্শের ওপরেও খুব রাগ হয়েছিল,যিনি ছিলেন সেই আন্দোলনের অন্যতম মাথা৷এই চেপে থাকা রাগের স্তুপ ক্রমশ বাড়তে থাকে, যখন দেখেছিলাম, হাতে বন্দুক তুলে নেওয়া কিছু মানুষ সেখানকার স্থানীয় ব্যাঙ্ক ও পুলিশ স্টেশন বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছিল l রাগ হয়েছিল সেই পুলিশকর্মীর ওপরেও যে আমাকে হাত ধরে আমার ব্যাগ ছিনিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল, আর মাটিতে ঠেসে ধরেছিল, মাথার পিছনে ছুঁচালো ঠাণ্ডা কিছু চেপে ধরে,যা কোন ডাণ্ডা ছিল না। আমি তা দেখতে পাইনি, কিন্তু আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গিয়েছিল৷ প্রত্যেক মুহুর্তেই আমি রাগে ফেটে পড়তাম সেখানকার তৎকালীন সরকার থেকে শুরু করে সেই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির ওপরে৷ ঠিক করতে পারতাম না, কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক ৷ কিন্তু আমি ভাগ্যবান ছিলাম, আমি সেই অবস্থার থেকে পালিয়ে আসতে পেরেছিলাম ৷ এইসব স্মৃতিগুলোই পুনরায় মনে পড়ে একদিন যখন এক ফুটফুটে কাশ্মীরি বালক খুব মিষ্টি ভাবে আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘‘তুমি নিশ্চয় একজন কাশ্মীরি, তাই নয় কি?” আমি তখন উত্তর খুঁজছি, ইচ্ছে করেছিল সেই শিশুটিকে বলি_“হ্যাঁ আমি কাশ্মীরি, আমরা সবাই কাশ্মীরি I আমরা সবাই এই স্বর্গরাজ্যের অঙ্গ। আমি বলতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলাম যে আমরা তোমাদের জন্যই এখানে আছি, আমরা তোমাদেরই মানুষ ৷আমি চাইছিলাম,সেই বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করি, তার গাল টিপে তাকে বলি, হ্যাঁ, আমিও একজন কাশ্মীরি, এবং আমি কাশ্মীরকে ভালবাসি আর তোমাদেরকেও৷

কিন্তু তা আমি করিনি, কারণ প্রকৃতপক্ষে আমি কাশ্মীরি নই, আমি টুরিস্ট হয়েও কাশ্মীরে আসিনি, আমি সেই বাচ্চাটিকে ভালবাসতে আসিনি, আমি এসেছি কাশ্মীরে ভারতের একজন সেনা হয়ে।

কাশ্মীর আমার কাছে শুধুমাত্র দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র, যা আমাকে পালন করতে বলা হয়েছে। এক দুঃসাধ্য কাজ যেভাবেই হোক সেটা করতে হবে সম্পূর্ণ গুরুত্বের সাথে। আমি এখানে ক্যামেরা কাঁধে বেড়াতেও আসিনি, বা আসিনি এখানে ফাইজ বা গুলজারের লেখা কবিতার বই মূখস্থ করতে।
আমাকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, মারার জন্য এবং তার জন্যই আমাকে সশস্ত্র করে তোলা। আমার সাহিত্য হল রক্ত। আমি সেই জমিনের সুন্দরতা উপভোগ করার শিক্ষা পাইনি, যা পেয়েছি, সীমারেখা টানা দুটো দেশের মাঝখানে পড়ে থাকা একখণ্ড জমিতে অবস্থিত হিংসার শিক্ষা ৷ অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য অনুভব করার শিক্ষার জায়গায় আমার মাথায় ঝড় তুলে দেওয়া হয়েছে সেই উপত্যকার রক্তাক্ত এবং ভয়াবহ এনকাউন্টারের দৃশ্য ৷ আমাকে কখনোই শেখানো হয়নি কাশ্মীরিদের আপন করে নিতে,শেখানো হয়েছে তাদের হুকুম করতে,সন্দেহভাজন দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে নিতে, দরকারে ব্যবস্থা নিয়ে নিজের বেঁচে থাকাকে সুনিশ্চিত করতে।

আমার কাছে সেই শিশুটিও ততটা সরল নয়,যতটা সে। শিশু বলতেই ভেসে আসে আমার মস্তিষ্কে গুপ্ত খবর, আগ্নেয়াস্ত্র শিশুদের ছবি যাদের সম্বন্ধে জানতে পেরেছি ব্যাপক কেস স্টাডির মধ্যে দিয়ে।
সেই চকচকে সুন্দর নীল চোখ, লাল আপেলের গাল আর মিষ্টি হাসি থাকা সত্বেও আমার সন্দেহের দৃষ্টি দিয়ে তাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পরীক্ষা করে নিতে হয়, কি আছে তার শরীরে লুকানো! তার বলা কথার প্ৰতি মনোনিবেশ করার আগেই চোখের সামনে ফুটে ওঠে, সিকিউরিটি ফোর্সের সামনে নিজেকে আত্মঘাতী বোম হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার ছবি। তার চুলে হাত বোলানোর আগেই কেন জানি না, নিজে থেকেই আমার তর্জনী শক্ত হয়ে আসে ট্রিগারে ৷
না, আমার বন্ধু, আমি একজন কাশ্মীরি নই, আমি হতেও পারি না। আমাকে আশাও করনা যে আমি তা হয়ে উঠবো, আমাকে সেই শিক্ষা দেওয়া হয়নি, তাই আমি আর কোন উত্তর দিতে পারলাম না। তবুও এত কিছু ভেবে গেলাম এক নিমেষে৷কিছুক্ষনের মধোই সেই বাচ্চাটির মা এলো দৌড়াতে দৌড়াতে,তাকে কোলে তুলল এক মুহূর্তের মধ্যে এবং অবজ্ঞামূলক ভঙ্গি করে, দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল একবারের জন্যও পিছনে না তাকিয়ে I
আজ হয়তো সেই বাচ্চাটি বুরহানের বয়সি I আমি এখনও তাকে কেন জানি না ভালবাসতে পারি না, কারণ সেই সমীকরণগুলো আবার মাথার মধ্যে ভিড় করে আসে। আর তাই,এত কিছুর বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ কাশ্মীর আজও জ্বলছে I
--দিনেশ তিওয়ারি(ভারতীয় আর্মিতে মেজর পদে নিযুক্ত ছিলেন)
প্রথম প্রকাশ kasmirobserver.net
যুক্তিবাদী পত্রিকা।

If you found this article interesting, please copy the code below to your website.
x 
Share

Leave a Reply