কুসংস্কারের দাগ শুধুই সচেতনতার প্রচারে যাবেনা, চাই সঠিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবিক প্রয়োগ।- অনাবিল সেনগুপ্ত

লিখেছেন-অনাবিল সেনগুপ্ত

বর্ষাকাল মানেই সাপের উৎপাত । সর্পদংশনের ঘটনাও এই সময়ই বেশি হয় । পরিসংখ্যান বলছে , আমাদের দেশে প্রতিবছর সাপের কামড়ে প্রায় 50 হাজার মানুষের মৃত্যু হয় । বেসরকারি মতে, সংখ্যাটি লক্ষাধিক । আসলে আমাদের দেশে এখনও বহু মানুষ সর্পদংশনের পর ডাক্তারদের তুলনায় ওঝা, গুণীন, ঝাড়ফুঁকের উপর বেশি ভরসা রাখে । ফলে রোগীর গুরুত্বপূর্ণ প্রথম কয়েক ঘন্টা বিনা চিকিৎসায় নষ্ট হয়ে যায় । সমীক্ষা অনুযায়ী সাপে কাটা রোগীদের মধ্যে মাত্র 22 শতাংশ সরকারি হাসপাতালে আসেন । এর প্রধান কারণ সচেতনতার অভাব।

বিভিন্ন বিজ্ঞান সংগঠন এবং যুক্তিবাদী সমিতির একটা লাগাতার সচেতনতার প্রচার আছে। সংঙ্গে সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে হাসপাতাল গুলোতে ব্যতিক্রম নাহলে AVS মজুত রাখা হচ্ছে। যা প্রতিটি চিকিৎসা কেন্দ্রে সুনিশ্চিত করতেই হবে। সরকারের প্রচারের প্রয়াস আছে। কিন্তু কিন্তু দীর্ঘ কুসংস্কারের দাগ লেগে রয়েছে গ্রামবাংলায়। সাপের কাটা রুগীর সাথে প্রথার নামে (যেটা ঝাড়ফুঁক তুকতাক হোক বা অন্যকিছু অবৈজ্ঞানিক প্রথা) ব্যবস্থা নিচ্ছে আত্মীয় পরিজন (অনেক ক্ষেত্রে সব জানবার পরও) পরিস্থিতি ঘোরালো করে দিচ্ছে। এবং হাসপাতালে গেলেও রুগীর মৃত্যু হচ্ছে। তখন আবার উনারা ছড়াচ্ছে সাপেকাটা রুগীদের বাঁচানোর ক্ষমতা নেই চিকিৎসক বা ব্যবস্থা নেই হাসপাতালের।। এক্ষেত্রে দুটি জিনিষ ঘটছে :- ১) একটা ইচ্ছা/অনিচ্ছা কৃত মৃত্যুর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, ২) কুসংস্কারের ভীত অক্ষত রয়ে যাচ্ছে প্রথার রূপে।

আবার বাস্তবে দেখা যাচ্ছে :- ১) পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিপর্যয়ে মৃত্যুর জন্য ২লক্ষ টাকাও দিচ্ছে সাপেকাটা রুগীর পরিবারদের। শুধুই পোষ্টমোর্ডাম রিপোর্টে (হার্ট ফেল বা অন্য অবহেলা নয়) সাপে কেটেছে লিখে দিলেই হল। ২) আর ওইসব ওঝা, গুনিন বা জানগুরুরা ঝাড়ফুঁক তুকতাকের ব্যবসার নামেই গ্রামবাংলায় ব্যবহৃত হচ্ছে কন্টেক কিলার বা সুপারি কিলার রূপে। এইসব ক্ষেত্রে সরকারের কোন উদ্যোগ নেই যেমন চলছে চলুক, কিছু উদ্যোগে নেওয়া যেতেই পারে যেমন :- ১) এলাকার ওইসব ওঝা,জানগুরু বা গুনীনদের এই সুপারি কিলিং এর প্রকাশ্যে ব্যবসা বন্ধ করার জন্য আইন প্রয়োগ, ২) সঠিকতর পুলিসি তদন্তের ব্যবস্থা যেখানে কি কারনে রুগীর পরিবারবর্গ সরাসরি হাসপাতাল ভর্তি করলো না --- সঠিক শিক্ষা নেই বা চেতনার অভাব, প্রথায় অনড় না সত্যি কোন হত্যার পরিকল্পনা কাজ করেছে, এবং ৩) টাকা পাবার পর পরিবারবর্গ এর থেকে মুচেলেখার বা স্বেচ্ছায় ঘোষণাপত্র লেখার ব্যবস্থা নেই; যে এরপর এই ভুল বা ভুলচর্চা নিজে বা কাউকে করতে দেবেনা। বা এদের দিয়েই সরকার যদি প্রচারের ব্যবস্থা করে তাদের নিজস্ব অঞ্চলে, তাহলে অবশ্যই ভালো ফল পাওয়া যাবে আশাকরি । এই সমাজের অনিচ্ছাকৃত মৃত্যুর মিছিল একধাপে অনেক কমে যাবে। যেরকম চমকপ্রদ ফল পাওয়া গেছে মাদক (পোস্ত) চাষের ক্ষেত্রে, সরকারের নির্দেশ যে গ্রামের কোথায় অবৈধ পোস্ত চাষ হলে গ্রাম পঞ্চায়েতের সদ্যস্যকেই ধরা হবে বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে যদিনা সে আগের থেকেই খবর দেয়। এই একি ব্যবস্থা ওইসকল কুসংস্কাররের বিরুদ্ধে (ওঝা,জানগুরু বা গুনীনদের ঝাড়ফুঁক তুকতাকের অবৈধ ব্যবসা) করলে উক্ত মৃত্যুর হার শূন্যতে নেমে যাবে আশা রাখি।

সরকারি আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার (তৎপরতার সংঙ্গে এবং গ্রামবাংলার প্রতিটি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ওই চিকিৎসা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে হবে) সাহায্য নিলে এবং প্রশাসনের ভারতীয় আইন [যেমন Drugs and Magic Remedies (Objectionable Advertisements) Act, 1954, Drug and Cosmetic Act 1940 (Amendment 2009), IPC 420, IPC 302 or IPC 303 ইত্যাদি] অনুযায়ী ওঝা, গুণিন, তান্ত্রিক বা জানগুরুদের ঝাড়ফুঁক তুকতাক তন্ত্রের নামে অবৈধ বুজরুকি ব্যবসার এবং ওইসকল বুজরুক বা পরিকল্পিত হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত মূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে এইসব কুসংস্কারের কালো দাগ (সাপে কাটা রুগীর মৃত্যু থেকে, ডাইনী প্রথার নামে নির্যাতন, ভড়ের নামে নারী নির্যাতন ইত্যাদি) গ্রামবাংলার থেকে সমূলে উৎপাটিত হবে।

If you found this article interesting, please copy the code below to your website.
x 
Share

Leave a Reply