রাষ্ট্র চাইছে একটা দাঙ্গা হোক

মনীশ রায়চৌধুরী

দেশের জনগণ নিজ অধিকার সম্পর্কে সচেতন না হলে, জাত ধর্মের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকায় সংগঠিত না হতে পারলে তা নিশ্চিন্তে শোষণ চালানোর পক্ষে সহায়ক হয়।
রাষ্ট্র তাই নানা প্রকারে সেই চেষ্টাই করে থাকে।

প্রথমত, ক্ষমতার দালালরা ভুল বুঝিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করল।
৭০ বছর কেটে গেলেও হিন্দু মুসলমানে পারস্পরিক অবিশ্বাস আজও বিদ্যমান।
সুপ্ত আগ্নেয়গিরির জেগে ওঠার মতই তা মাঝে মাঝেই দাঙ্গার রূপ নিয়ে মানবতাকে জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয়।

এর পরবর্তী পদক্ষেপ হল সংবিধানে বর্ণিত বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিদ্যালয়ে, মাদ্রাসাতে বছরের পর বছর ধর্মীয় শিক্ষা চালু রাখা।
তাই শিশুরা হনুমানের হাস্যকর গাঁজাখুরি কান্ডকারখানা অথবা মহম্মদের বোরাকে চড়ে আল্লাহর সাথে দেখা করার আজগুবি কথা শিখছে।
কচি মাথা গুলোতে ছোটবেলাতেই প্রোগ্রামিং করে দেওয়া হচ্ছে যে মানুষ হওয়ার আগে ‘হিন্দু’ বা ‘মুসলিম’ হতে হবে।

এভাবে ভেদাভেদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলে রাষ্ট্র পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপে মন দেয়।
তাই যখন বাবরি মসজিদ ভাঙা হল, পুলিশ প্রশাসন কোন অলিখিত নির্দেশে নপুংসকের মত দাঁড়িয়ে থাকল।
এভাবে একদিকে সরকারী মদতে উগ্র হিন্দুত্ববাদকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।
গোমাংস রাখার গুজবে বৃদ্ধ আখলাক মরছে।
মোল্লারা সাধারণ মুসলিমদের এই সুযোগে বোঝাচ্ছে যে ভারত তাদের দেশ নয়।
সাধ্বী প্রজ্ঞারা আইনকে ফাঁকি দিয়ে শাসকদলের সহায়তায় ছাড়া পেলে তাদের বিশ্বাস আরও মজবুত হচ্ছে।

আবার, অপরদিকে চলছে ইমামদের তুষ্ট করার রাজনীতি। সংবিধানকে পরিহাস করে রয়েছে ‘মুসলিম ল বোর্ড’।
তারা তিন তালাক নিয়ে মধ্যযুগীয় ফতোয়া জারি করলেও প্রশাসন ভোট ব্যাঙ্ক বাঁচাতে নির্বিকার থাকছে।
রাজীব গান্ধীর আমলে ঘটা ‘শাহবানু মামলা’ আমরা কেউ ভুলিনি।
গরিব মুসলিমরা অভুক্ত থাকলেও, প্রকৃত শিক্ষার সুযোগ না পেলেও তাদের ইমামরা কিন্তু ভাতা পায়।
ঠিক এই কারণেই তারা কোনদিন চাইবেনা গরিব মুসলিমদের অবস্থার কোন উন্নতি হোক।
তাহলেই তো ‘সংখ্যালঘু’ তকমার জন্যে পাওয়া টাকার স্রোত বন্ধ হয়ে যাবে।
কয়েকটি স্থানে কিছু ইমামের অভিযোগের ভিত্তিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা পুজো বন্ধ হয়ে গেছে।
এসকল অভিযোগ কিন্তু সাধারণ মুসলিমরা করেনা, কারণ তারা নিজেরাও বংশানুক্রমে এই সংস্কৃতিতেই বড় হয়েছে।
প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এখানেও হিন্দু মৌলবাদীদের লোক ক্ষ্যাপাতে সাহায্য করেছে।
প্রতি বছর হজে যেতে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়, যা ধর্মনিরপেক্ষ দেশে অনুচিত।
ফলে রামভক্তেরা লোককে উসকিয়ে বলে, “দেখ, আমাদের তীর্থ যাত্রায় কিন্তু ছাড় দেয়না, আমাদের পুরোহিতদের তো ভাতা দেয়না। এখনি প্রতিরোধ না করলে সব ঐ মোল্লারা দখল করে নেবে।”

এভাবে দু’তরফের লোক ক্ষেপানো হয়ে গেলে অন্তিম পদক্ষেপ হল অস্ত্র প্রশিক্ষিত মৌলবাদীদের জনগণের সাথে মিশিয়ে দেওয়া।
তাই একদিকে পুলিশের চোখের সামনেই রামভক্তেরা অস্ত্র নিয়ে মিছিল করছে।
গুজরাট দাঙ্গার মাথাদের তো আগেই ছাড়া হয়েছে।
তারাই এই হিন্দু সেনাকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
আবার প্রশাসনের ‘অতন্দ্র’ প্রহরাকে ফাঁকি দিয়ে JMB এবং অন্যান্য মুসলিম মৌলবাদী দলের সদস্যরা দেশে ঢুকে পড়ছে। আসলে রাষ্ট্র মনেপ্রাণে চাইছে যে একটা দাঙ্গা হোক।

কিন্তু, এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধলে মরবে কে?
মরবে সেই গরীব পুলকার চালক রহমত আলি যে রোজ আপনার বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে আসে।
কার দোকান লুঠ হবে?
গরীব হরেন মুদিরই দোকান লুঠ হবে।
যার দোকান থেকেই ঈদের সিমাই কেনা হয়।
ইমাম সাহেব আর শঙ্করাচার্যের গায়ে কিন্তু আঁচড়ও লাগবেনা।
তারা টাকার গদিতে শুয়ে থাকেন।
তারা চাইলেই বিদেশের প্লেন ধরতে পারবেন।
তাই দাঙ্গাটি বাধিয়েই একদল আরবের পথে আল্লাহ’র বাণী দিতে বেরিয়ে পড়বেন।
আরেকদল তো ইউরোপের ঠান্ডা ঘরে বসে ‘স্পিরিচুয়াল সায়েন্স’ নামক অশ্বডিম্ব বিষয়ে বক্তৃতা দেবে।

আপনার সামর্থ নেই।
তাই আপনি কোথাও যেতে পারবেননা।
অতএব, জয় শ্রীরাম আর আল্লাহু আকবরদের হাতে মরবে কে?
কে আবার সেই আপনি।

If you found this article interesting, please copy the code below to your website.
x 
Share

Leave a Reply