প্রসঙ্গঃ জাতীয়তাবাদ

মনীশ রায়চৌধুরী

আমার মতে ব্রিটিশরা আসার আগে ভারতীয়ত্ব বলেই কিছু ছিলনা।
এই সুপ্রাচীন ভূখণ্ডে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এসেছে।
তারা সাথে করে এনেছে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, শিল্পরীতি, বিজ্ঞানভাবনা।
এই ভূখণ্ড সবাইকে আপন করে নিয়েই এগিয়েছে।
এইজন্যেই এদেশে এত ভাষা, এত ধর্ম, এত সাহিত্য-শিল্পরীতির বিকাশ।
এই বহুত্ববাদই আমাদের উৎকর্ষের, বিকাশের, গর্বের কারণ।

আজ এই বহুত্ববাদকেই মুছে ফেলে সবাইকে জোর করে একই ছাঁচে ফেলে একটা ‘প্রোডাক্ট’ বানানোর চেষ্টা চলছে।
এই প্রোডাক্টের নাম ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান’।
কিন্তু, মানুষতো মাটির তাল নয়।
তাকে জোর করে ছাঁচে ফেললে মানুষ না হয়ে মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট জড়পিন্ড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল এবং এই আশঙ্কা ইতিমধ্যেই বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে।
তাই মানুষের মত দেখতে এই জীবগুলো ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষকে প্রকাশ্যে খুন, ধর্ষণের হুমকি দিতেও এতটুকু কুণ্ঠিত হয়না।

আজকের কাগজেই তো পড়লাম, নয়ডাতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী আফ্রিকানদের বিরুদ্ধে বর্ণবৈষম্যমূলক আচরণ শুরু হয়েছে।
শাসকদলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে তাদের উৎখাত করার প্রচেষ্টা চলছে।
নয়ডার অধিকংশ বাসিন্দা হয়ত এটাও জানেনা যে নাইজেরিয়া, উগান্ডা, ইথিওপিয়া এসব দেশ আসলে পৃথিবীর ম্যাপে কোথায় অবস্থিত।
কিন্তু, প্রচারের কল্যাণে তাদের মস্তিষ্কে এই ধারণা বধ্যমূল হয়েছে যে আফ্রিকানরা অবমানব, বর্বর, নরখাদক।
অতএব এই শাশ্বত, পুণ্যভূমি থেকে এদের বিতাড়িত করা এদের কাছে ‘পবিত্র জাতীয়তাবাদী’ কর্তব্য হয়ে উঠেছে।

আমরা এরই মধ্যে ভুলে গেছি মাত্র ৭০ বছর আগে আমাদের নিজেদেরই বর্ণবৈষম্যের শিকার হতে হত।
ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপন আমাদের মন থেকে মুছিয়ে দিয়েছে কিছুকাল আগেই আমাদের ‘Dirty Nigar’, ‘Dogs and Indians are not allowed inside’ জাতীয় মধুর বচন সহ্য করতে হত।
আমরা এরই ভিতর ভুলে গেছি, এদেশ কোন এক গান্ধীর দেশ।
এই দেশই একদিন সাউথ আফ্রিকার কালা আদমিদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সাদা চামড়ার সাথে তারাও যাতে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে পারে তাতে সহায়তা করেছিল।

কোন দেশের মানুষ যখন এইরকম মানবতাবিরোধী চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয় বুঝতে হবে সেই দেশের পতন আসন্ন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও হিটলারের নেতৃত্বে সুপরিকল্পিত ভাবে প্রচার করা হয়েছিল যে, বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন ইহুদিরা অবমানব (Sub-species)।
তাই তাদের হত্যা করা কোন অপরাধ নয়।
ইতিহাস সাক্ষী জার্মানিকে এর জন্যে কোন মূল্য দিতে হয়েছিল।

সরকার আর পোষা মিডিয়ার বদান্যতায় আজ আমাদের সমাজে এরাই ‘দেশপ্রেমিক’, ‘ভারতরক্ষকে’র উপাধি লাভ করছে।
আমরা ভুলে যাচ্ছি, যেদিন এই বহুত্ববাদী সংস্কৃতি থাকবেনা সেদিন একটা অন্তঃসারশূন্য খোলসই পড়ে থাকবে।
প্রাণময়, বিকাশের সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ ভারত সেদিন কোথাও থাকবেনা।

If you found this article interesting, please copy the code below to your website.
x 
Share

Leave a Reply