জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রের পার্থক্য-প্রবীর ঘোষ

জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রের পার্থক্যককে ঠিক মত বুঝতে হলে কয়েকটি শব্দের সংজ্ঞা বুঝে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি ;যেমন - 'বিজ্ঞান', 'জ্যোতির্বিজ্ঞান' ও ' জ্যোতিষশাস্ত্র'।

★বিজ্ঞান★

বিজ্ঞান শব্দের অর্থ কী? অর্থাৎ শব্দটির সংজ্ঞা কী? --এটা জানা অত্যন্ত জরুরি। 'প্রেততত্ত্ব' থেকে 'স্পর্শচিকিৎসা', 'ফেংশুই' থেকে 'জ্যোতিষশাস্ত্র' ইত্যাদি হিজিবিজি ব্যাপার- স্যাপার নিজেদের বিজ্ঞান বলে যে বিশাল প্রচার চালাচ্ছে, তাতে সাধারণ থেকে অসাধারণ মানুষ --প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা উত্তরোত্তর বাড়ছে। 'বিজ্ঞান' শব্দের অর্থ বিশেষ জ্ঞান--এমন অতি-সরলীকৃতস সংজ্ঞা মানলে গোলমাল বাড়বে। তাহলে তো চুল-ছাটায় বিশেষ জ্ঞান থাকার জন্য মধু নাপিত কে বিজ্ঞানী বলতে হয়। স্মাগলিংয়ে বিশেষ জ্ঞানের জন্য 'ছোটা রাজন'-কে ভারতের সেরা বিজ্ঞানীর মুকুটটা পরিয়ে দিলেও আমাদের কিছু বলার থাকে না। 'বিজ্ঞান' শব্দের এমন সংজ্ঞাকে মেনে নিলে পৃথিবীর প্রায় সব পেশার মানুষকেই 'বিজ্ঞানী' বলতে হয়।

বিজ্ঞান শব্দের আরও দুটি প্রচলিত শব্দ হল ঃ--(১)-পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের পর গৃহীত সিদ্ধান্তকে বলে বিজ্ঞান। (২)-পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ প্রমাণ ইত্যাদির দ্বারা লব্ধ শৃঙ্খলাবদ্ধ জ্ঞানকে বলে 'বিজ্ঞান '। ----- এই দুটি সংজ্ঞার মধ্যেও সরলীকরণের একটা ঝোক আছে। এই সংজ্ঞা দুটিও পুরোপুরি ঠিক নয়।

বিজ্ঞানে তত্ত্ব আছে, অংক আছে, আবার, পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণও আছে। বিজ্ঞানের পরীক্ষা বলতে শুধুমাত্র গবেষণাগারে যন্ত্রপাতির সাহায্যে পরীক্ষা বোঝায় না। বিজ্ঞানের পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে একটি কল্পিত প্রস্তাব বা Hypothesis , যে প্রস্তাবনায় পৌছতে কল্পিত পরীক্ষার প্রয়োজন হয়,অংকের সাহায্য নিয়ে পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি রয়েছে যে বিষয় নিয়ে গবেষণা হবে হবে, সেই বিষয়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত যে-সব গবেষণা ইতিপূর্বে হয়েছে বা হচ্ছে, সেগুলো জানা। বিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্বের সঙ্গে সেগুলোর সঙ্গতির পরীক্ষা। প্রস্তাবনার সঙ্গতির পরীক্ষা। প্রয়োজনমত কল্পিত প্রস্তাবনার পরিবর্তন করা। এরপর আসে কল্পিত প্রস্তাবনা বা তত্ত্বটিকে বাস্তবে প্রয়োগ করে ফলাফলের পরীক্ষা। খুব সংক্ষেপে 'পরীক্ষা' শব্দটিকে আমরা ব্যবহার করেছি । বাস্তবে অসংখ্য পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানের তত্ত্বকে যাচাই করা হয়, তারপর আসে সিদ্ধান্তে পৌছবার প্রশ্ন। এ-ভাবেই যাচাই করার আগে বিশ্ববিখ্যাত বিভিন্ন গৃহীত তত্ত্বও প্রস্তাবনা মাত্র। বিজ্ঞানের কল্পিত প্রস্তাবনার সঙ্গে জড়িত বিশ্বাসগুলো এসেছে পূর্বসূরি বিজ্ঞানীদের প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব ও নানা গবেষণা থেকে। এই বিশ্বাসের সঙ্গে সত্যের একটা সম্পর্ক থাকে।

★জ্যোতির্বিজ্ঞান★

'জ্যোতির্বিজ্ঞান' বা ইংরেজী ' Astronomy' হল বিজ্ঞানেরএকটি শাখা। যেমন শাখা হল পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ইত্যাদি। জ্যোতির্বিজ্ঞান হল এমন একটি বিজ্ঞান যার সাহায্যে সৌরজগৎ, বিশ্ব-ব্রক্ষ্মাণ্ড,মহাবিশ্বের নানা জ্যোতিষ্ক, নক্ষত্র, উল্কা, গ্রহ, উপগ্রহ, ব্ল্যাক হোল ইত্যাদির গতিপ্রকৃতি ও কাজ-কর্ম বুঝতে পারি।

মহাকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য পৃথিবীতে বহু মানমন্দির (Observatory) আছে। পৃথীবিতে যত মানমন্দির (Observatory) আছে সেইসব মানমন্দির থেকে দূরবীন দিয়ে মহাকাশের গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করা হয়। অংক কষে এদের যে অবস্থান ও গতিপথ পাওয়া গেছে তা দূরবীনে দেখা অবস্থান ও গতিপথের সঙ্গে মিলছে কি না, দেখা হয়। কোনও পার্থক্য দেখা গেলে সে বিষয়ে গবেষণা চালানো হয়। প্রয়োজনে সূত্রাবলীর সংস্কার করা হয়। সমস্ত মানমন্দিরের কাজে সমন্বয়সাধনের জন্য গঠিত হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল আস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন। কোনও মানমন্দির থেকে পর্যবেক্ষণের পর কোনও রকমের সন্দেহ দেখা দিলে তারা সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি ইউনিয়নকে জানায়। ইউনিয়ন অন্যান্য মানমন্দিরকে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করে। চলে গবেষণা। তারপর ইউনিয়নের নেতৃত্বেই সূত্রাবলীর প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হয়। পৃথিবীর আটটি দেশের এফিমেরিস সেন্টার থেকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র ইত্যাদির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য এবং মহাকাশ বিষয়ক আরও নানা তথ্যসম্বলিত বই প্রকাশ করা হয়। এই বইকেই বলে 'আস্ট্রোলজিক্যাল এফিমেরিস', সংক্ষেপে 'এফিমেরিস'। প্রাচীন ও মধ্যযুগে ভারতীয়রা 'জ্যোতির্বিজ্ঞান' কে বলতেন 'জ্যোতিষ'। এখন অবশ্য বহুল প্রয়োগের ফলে 'জ্যোতিষ' বলতে ভাগ্যগণনার শাস্ত্রকে বোঝায়।

★জ্যোতিষশাস্ত্র★

'শাস্ত্র' শব্দটির ওপর প্রথমেই আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। 'শাস্ত্র' শব্দের অর্থ --বেদ,তন্ত্র, দর্শন, পুরাণ ইত্যাদি অনুশাসন বা বিধি বিষয়ক গ্রন্থ। এরপর আমরা স্পষ্টতই সিদ্ধান্তে পৌছতে পারি যে--'শাস্ত্র' বিজ্ঞান নয়। উপাসনা - ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কীত প্রাচীন ভ্রান্ত ধারনায় কণ্টকিত বিধি বা নিয়ম-কানুন বিষয়ক গ্রন্থ হল 'শাস্ত্র'। এমন কল্পনাশ্রিত হিজিবিজি চিন্তায় ভরা বই'কে আমরা বিজ্ঞান - বিরোধী বই হিসাবে চিহ্নিত করে থাকি। এগুলোকে কেউ বিজ্ঞানের বই মনে করলে তা তার অজ্ঞতারই পরিচয় বহন করে। ছোটোবেলা থেকে শাস্ত্র' গ্রন্থ -গুলোকে 'সত্য', ' বিজ্ঞানেরও বিজ্ঞান' ইত্যাদি উদ্ভট সব ভাবনায় আচ্ছন্ন থাকার পরিনতিতেই, তারা এমন* সব অপঅপরিণতমনষ্ক মধ্যযুগীয় কথা বলে।

আলকামির মত অপবিজ্ঞানের পথ ধরে একটু একটু করে কেমিস্ট্রির বর্তমান অবস্থায় পৌছনোটা একটা ইতিহাস। তেমনই ভ্রান্ত জ্যোতির্বিজ্ঞান দীর্ঘ পথ পরিক্রমার পর আজ এ জায়গায় এসেছে।

পরশপাথর শুধু সোনা তৈরির ক্ষমতা রাখত না, সর্বরোগে অব্যর্থ ঔষধেরও নাকি কাজ করত। এই ধরনের ভুলভাল ধারনা নিয়ে গবেষকদের বহু কর্মকান্ডই প্রাচীন কালে চালু ছিল। এইসব গবেষকদের ভুল-ভ্রান্তি-ব্যর্থতার অর্থ এই নয় যে, তাতে সব গবেষকদের কর্মকান্ডই গুরুত্বহীন বলে আমরা ধরে নেব। এইসব ভুল ও ব্যর্থতা অনেক সময় সাফল্যের ধাপও। ভুলকে ত্যাগ করেই সঠিক পথে চলতে হয়, এটাও আবার মনে রাখতে হবে আমাদের। নতুবা পরশপাথরের মত অদ্ভুত মিথ্যে অলীক কিছুর পিছনেই ঘুরে সময় নষ্ট করতে হবে।

জ্যোতিষ বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রথম স্তরে ব্রহ্মান্ডের চিন্তা ছিল পৃথিবীকেন্দ্রিক। জ্যোতিষ সে ভুল চিন্তাকে ফেলে দিয়ে আজ যে জায়গায় পৌছেছে, সে জায়গায় জ্যোতিষশাস্ত্র পৌছবার চেষ্টাই করেনি। ভুল পৃথিবীকেন্দ্রিক চিন্তাকে আঁকড়ে রয়েছে। গ্রহ - নক্ষত্ররা মানুষের ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রিত করে -- এমন অদ্ভুত বিশ্বাসকে পণ্য করেছে। কোনও কিছুর যথার্থতা বিচার করতে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা গ্রহণ করতে হয়। এইসব পরীক্ষার সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম আছে। সে'সব নিয়ম নিষ্ঠাসহকারে অনুসরণ করতে হয়।

কনট্রোলড এক্সপেরিমেন্ট বা রানডাম সাম্পেলিং-এর সাহায্য নিয়ে যতদিন না প্রস্তাবনা যথেষ্ট পরিমাণে সমর্থন যোগাড় করতে পারছে, ততদিন বিষয়টিকে প্রকল্পের (hypothesis) বেশি গুরুত্ব দেওয়া যায় না। প্রকল্প কখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। 'জ্যোতিষশাস্ত্র' বা 'ফলিত জ্যোতিষ' আজ পর্যন্ত প্রকল্পের গন্ডিতেই প্রবেশ করতে পারেনি। বলা ভাল, কোনও জ্যোতিষী বা জ্যোতিষীদের সংস্থাও প্রকল্পটিকে খাড়া করতে সামান্যতম চেষ্টা করেনি। জ্যোতিষশাস্ত্র বলে --একজন মানুষের জন্মকালীন গ্রহ - নক্ষত্রের অবস্থানের ওপর ভবিষ্যৎ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত নির্ধারিত হয়ে যায়। অর্থাৎ ভাগ্য পুর্ব-নির্ধারিত। জ্যোতিষশাস্ত্র দাবি করে, তার গনণা পদ্ধতির সাহায্যে জন্ম-সময়ের গ্রহ - নক্ষত্রের অবস্থান অনুসারে একজনের অতীত বর্তমানের প্রতিটি ঘটনার হদিস পাওয়া সম্ভব। কী ভাবে সম্ভব ? বিজ্ঞানটা কী? বিজ্ঞানটার নাম মনস্তত্ত্ব। এর জন্য বিদ্যে-বুদ্ধির তেমন প্রয়োজন হয় না। সাধারণ জ্ঞান দিয়েই একটা মানুষের জীবনের অনেক কিছুই বোঝা যায়। জ্যোতিষীরা মানুষের ভাগ্য বলে এই কমনসেন্স থেকেই ; জ্যোতিষশাস্ত্রের সাহায্য নিয়ে কেউ-ই বলে না। জ্যোতিষশাস্ত্র হল অং-বং-চং বলে মানুষ ঠকানোর শাস্ত্র।

প্রাচীন কালে জ্যোতিষশাস্ত্র ছিল পরশপাথর তৈরির মতই এক অলীক চিন্তা। বর্তমানে সেই শাস্ত্রই প্রতারকদের পকেট কাটার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রের অতীত ইতিহাস অন্তত এই কথাই বলে।

জ্যোতিষশাস্ত্রের মধ্যে অবিরত গতিতে রচিত হয়েই চললো ব্যাপকতা। বহু পরীক্ষা - নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে বিজ্ঞানের দরবারে প্রতিষ্ঠা পেল 'জ্যোতির্বিদ্যা' অবিজ্ঞান হিসেবে পরিত্যক্ত হল 'জ্যোতিষশাস্ত্র' বা 'ফলিত জ্যোতিষ'। জ্যোতিষশাস্ত্র এমনই এক শাস্ত্র, যাতে বিস্তর চিন্তাগত বৈপরীত্য আছে নানা প্রশ্ন। এমন-ই একটি জরুরী প্রশ্ন -ভাগ্য যখন নির্ধারিত হয়েই আছে, তখন তাবিজ -কবজ -পাথর -মন্ত্রের ভাগ্য পরিবর্তনের ক্ষমতা থাকে কী করে? ---স্ববিরোধী এমন এক শাস্ত্র'কে যারা 'বিজ্ঞান'বলে, তারা হয় অজ্ঞ, নতুবা প্রতারক।

আজ না হোক কাল, কাল না হোক পরশু, পরশু না হোক তারপরে জ্যোতিষীদের জেলে পোরা শুরু হবে-ই। জ্যোতিষীদের বিরুদ্ধে অনেক আইন যখন আছে, তখন কতদিন আর আইনের প্রয়োগ বন্ধ থাকবে? 'জ্যোতিষী' পেশা হিসেবে গণ্য নয়, পেশাই নয় খুন করা বা স্মাগলিং করা।

যে কোনও রোগ গ্যারান্টি দিয়ে সারাবার নামে যারা তাবিজ, কবচ ইত্যাদি বিক্রি করে, তাদের ওই তাবিজ -কবচ ইত্যাদি 'ওষুধ' হিসেবেই বিবেচিত হবে। বিনা লাইসেন্স'এ এই জাতীয় ওষুধ বিক্রি অবশ্যই অপরাধ। ওই তাবিজ, কবচে অসুখ না সারলে, মৃত্যু হলে, ইন্ডিয়ান পিনাল কোডের ৩২০ ধারা মতে শাস্তি পাবে।

মুশকিল হল এইসব প্রতারকের বিরুদ্ধে প্রমাণ দাখিল করা। কারণ এরা কখনই নিজের ছাপান প্যাডে লিখে দেননা যে, অমুক ব্যক্তিকে অমুক কাজের জন্য এই তাবিজ, কবচ বা গ্রহরত্ন দিলাম। মূল্যবাবদ এতটাকা নিলাম। ফলে ঠকে গেলেও ব্যবস্থা নেওয়ার কোনও উপায় থাকে না। জ্যোতিষী ও অবতারদের 'মিথ' ভাঙতে ওদের বুজরুকি ফাসের একটা প্রক্রিয়া আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সমিতির কাজ এই নয় যে,সব বুজরুকদের নাঙ্গা করতে হবে। কারণ কু-সংস্কার মুক্তি আমাদআমাদের মূল লক্ষ্য নয়, উপলক্ষ। লক্ষ্য কু-সংস্কারকে কাজে লাগিয়ে যে অসাম্যের সমাজ ব্যবস্থা টিকে আছে, চূড়ান্ত পর্যায়ে তাকে আঘাত করা। ----প্রবীর ঘোষ। (বই-জ্যোতিষীর কফিনে শেষ পেরেক)।

★★★'যত্র' বা 'যন্ত্রম' : যে কোনও সমস্যার স্থায়ী সমাধান★★★ -----কলকাতা থেকে প্রকাশিত নামি দৈনিক পত্রিকাগুলোর দু'য়ের পৃষ্টা এখন তান্ত্রিক জ্যোতিষীদদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। কিছু টিভি চ্যানেল তো এখন পুরোপুরি 'তন্ত্র চ্যানেল'। তান্ত্রিক জ্যোতিষীদের বিজ্ঞাপনের সুবাদে ''যন্ত্র' বা 'যন্ত্রম' শব্দটা অদৃষ্টববাদীদের কাছে খুবই পরিচিত। ----জ্যোতিষীদের চেয়ে তান্ত্রিক-জ্যোতিষীদের রমরমাই বর্তমানে বেশি। ওরা 'যন্ত্র'কে প্রমোট করতে দারুণ দারুণ স্লোগান হাজির করেছেন। কপিরাইটারদের তৈরি দামি স্লোগান --'বিনা রত্নে স্থায়ী প্রতিকার', 'যন্ত্রমে নিশ্চিত সমাধান', 'রত্ন মেলে লাখে লাখ, যন্ত্র মেলে এক', 'তন্ত্রের শেষ কথা যন্ত্রম' ইত্যাদি কত না কথার রোশনাই। ----রত্নের তুলনায় যন্ত্রমের দিকে ঝোকার প্রবনতা বেড়েছে। তান্ত্রিক- জ্যোতিষীরা যেমন 'যন্ত্রম' দিতে বেশি বেশি করে ঝুঁকছেন, তেমনই নিয়তিবাদে বিশ্বাসীরাও প্রচারের চমকে গ্রহরত্নের চেয়ে যন্ত্রমের দিকে ঝুকেছন বেশি। সাধারণত পেসেন্টদের কাছে রত্ন বিক্রি করে মেলে দেড়'শো থেকে তিন হাজার। কিনতে যায় দশ থেকে দশ থেকে তিনশো। অর্থাৎ দাম মেলে একশো চল্লিশ থেকে দু'হাজার সাতশো টাকা।যন্ত্রম - এর বিক্রির দাম পাচ হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা--যা খুশি দাবে। বাড়তি দাম পাওয়া যায় চার হাজার ন'শো সত্তর টাকা থেকে আটচল্লিশ হাজার আটশো পর্যন্ত। সুতরাং যন্ত্রম এর দিকে পাল্লা ভারী তো হবেই।

বিজ্ঞাপনই এখন সবচেয়ে বড় জাদু। বিজ্ঞাপনে ভুলে সোনা-চাদি চেটে মানুষ মেধা-স্মৃতিকে বাড়াতে চাইছে। বিজ্ঞাপনের আকর্ষণী শক্তিতে মানুষ থেকে লক্ষ্মী-সরস্বতীকে বশ করতে চাইবে, তন্ত্রে নব্বই দিনে এইডস থেকে ক্যানসার সারাতে চাইবে - এতে অবাক হওয়ার কী আছে?

তন্ত্রে অবশ্য যন্ত্রের বা যন্ত্রমের কথা আছে। যন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে নানা অসম্ভব কাজ, অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে দেবার কথাও আছে। সত্যিই আছে। ঈশ্বর সত্যি হলে,তন্ত্র সত্যি হলে,যন্ত্রও সত্যি - অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু 'যন্ত্র' সত্যি কাজের কি না, সেটা জানার আগে 'যন্ত্র' কী- সেটা জানা জরুরী। অর্থাৎ যন্ত্রের সংজ্ঞা কী? যে সব তান্ত্রিক 'যন্ত্র' বা 'যন্ত্রম' চড়া দামে বিক্রি করেন, তারা যন্ত্রের সংজ্ঞা জানেন - এমন ভাবাটাই স্বাভাবিক। আমিও এমনটা-ই ভেবেছিলাম। জানি এদের অনেকেই স্কুলের গন্ডি পেরুতে পারেননি।তান্ত্রিক হবার জন্য স্কুলের গন্ডি পেরুনো জরুরী নয়। কিন্তু যারা হেকে - ডেকে সমস্ত সমস্যা সমাধানের স্বপ্ন দেখিয়ে 'যন্ত্র' বেচছেন, তারা 'যন্ত্র' শব্দটার সংজ্ঞাই জানবেন না - এটা অনৈতিক, এটা স্পষ্টতই প্রতারণা।

আজ পর্যন্ত রেডিও - টিভি ও সেমিনারে কম করে শ'দেড়েক জ্যোতিষীর মুখোমুখি হয়েছি।তাদের অনেকেই 'যন্ত্র' বা 'যন্ত্রম' দেন। 'যন্ত্র' জিনিসটা কী জিজ্ঞেস করলেই সব্বাই কেমন তোতলাতে থাকেন, গোলাতে থাকেন। ------প্রবীর ঘোষ। বই-অলৌকিক নয়, লৌকিক (পঞ্চম খন্ড)। প্রথম প্রকাশ ২০০৩,চতুর্থ সংস্করণ আগস্ট ২০১৩.

রেইকি গ্র্যান্ডমাষ্টার, ফেংশুই ক্ষমতার দাবিদার, জ্যোতিষী ও অলৌকিক ক্ষমতার দাবিদারদের প্রতি ★★২৫ লক্ষ টাকার চ্যালেঞ্জ★★

আজ এই বইটি প্রকাশের দিন থেকে আমি প্র★বী★র★★ঘো★ষ, এই বইটির লেখক, ঘোষণা রাখছি। বিশ্বের যে কোনও ব্যক্তি কোনও কৌশলের সাহায্য ছাড়া শুধুমাত্র অলৌকিক ক্ষমতার দ্বারা আমার নির্দেশিত স্থানে ও পরিবেশে নিম্নলিখিত যে কোনও একটি ঘটনা ঘটিয়ে দেখাতে পারলে, তবে তাঁকে ২৫ লক্ষ ভারতীয় টাকা দিতে বাধ্য থাকব। আমার এই চ্যালেঞ্জ আমার মৃত্যু পর্যন্ত অথবা প্রথম অলৌকিক ক্ষমতাবানকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।★যে ঘটনাগুলোর যে কোনও একটি অলৌকিক ক্ষমতায় দেখাতে হবেঃ---

১★রেইকি ক্ষমতায় অথবা অলৌকিক ক্ষমতায় আমার তরফ থেকে হাজির করা রোগীকে ১৮০ দিনের মধ্যে রোগমুক্ত করতে হবে। মৃত্যুর দায় পুরোপুরি বহন করতে হবে রেইকি মাষ্টার বা অলৌকিক ক্ষমতার দাবিদারককে। ২★অচল টেপরেকর্ডারকে, রেডিওকে রেইকি ক্ষমতার দ্বারা বা অলৌকিক উপায়ে সচল করতে হবে। ৩★'ফেংশুই'- এর অভ্রান্ততা প্রমাণ করতে হবে। ৪★'বাস্তুশাস্ত্র'- এর সাহায্যে লকআউট কারখানা খুলে লাভের মুখ দেখাতে হবে। ৫★জ্যোতিষশাস্ত্রের সাহায্যে বা অলৌকিক ক্ষমতাবলে আমার দেওয়া দশটি ছক বা হাতের ছাপ দেখে প্রত্যেক ছক বা হাতের ছাপের অধিকারীর অতীত সম্বন্ধে পাঁচটি করে প্রশ্নের মধ্যে অন্তত চারটি করে সঠিক উত্তর দিতে হবে। ৬★আমার তরফ থেকে হাজির করা মেয়েটিকে ১৮০দিনের মধ্যে বশীকরণ করতে হবে। ৭★আমার দেওয়া কোনও ছেলে বা মেয়েকে 'সরস্বতী কবজ' দিয়ে বা অলৌকিক উপায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম করাতে হবে। ৮★প্রজাপতি কবজে বা অলৌকিক ক্ষমতায় আমার দেওয়া ছেলে বা মেয়েকে ১৮০ দিনের মধ্যে বিয়ে দিতে হবে। ৯★আমার তরফ থেকে হাজির করা মামলা জেতাতে হবে। ১০★ তন্ত্রের দ্বারা বা অলৌকিক উপায়ে সন্তানহীনাকে জননী করতে হবে। সন্তানহীনাকে হাজির করব আমি। ১১★তন্ত্রের দ্বারা বা অলৌকিক উপায়ে যৌন-অক্ষমকে যৌন ক্ষমতা দিতে হবে। ১২★আমার দেওয়া চারজন ভারতবিখ্যাত মানুষের মৃত্যু সময় আগাম ঘোষণা করতে হবে। ১৩★প্ল্যানচেটে আত্মা আনতে হবে। ১৪★সাপের বিষ কোনও কুকুর বা ছাগলের শরীরে ঢুকিয়ে দেবার পর তাকে অলৌকিক উপায়ে সুস্থ করতে হবে। ১৫★বিষ পাথরের বিষশোষণ ক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। ১৬★কঞ্চি চালান, বাটি চালানের সাহায্যে চোর ধরে দিতে হবে। ১৭★থালা পড়ার সাহায্যে বিষ নামাতে হবে। ১৮★নখদর্পণ প্রমাণ করে চোর ধরে দিতে হবে। ১৯★চালপড়া খাইয়ে চোর ধরে দিতে হবে। ২০★যোগবলে শুন্যে ভাসতে হবে। ২১★যোগবলে ১০ মিনিট হৃদস্পন্দন বন্ধ রাখতে হবে। ২২★একই সঙ্গে একাধিক জায়গায় আবির্ভূত হতে হবে। ২৩★টেলিপ্যাথির সাহায্যে অন্যের মনের খবর জানতে হবে। ২৪★জলের ওপর হাঁটা। ২৫★এমন একটি বিদেহী আত্মাকে হাজির করতে হবে, যার ছবি তোলা যায়। ২৬★যা চাইব শুন্য থেকে তা হাজির করতে হবে। ২৭★মন্ত্রে দু'ঘন্টার মধ্যে বৃষ্টি নামাতে হবে। ২৮★মানসিক শক্তির সাহায্যে কঠিন কোনও বস্তুকে বাঁকাতে হবে বা সরাতে হবে। ২৯★অতীন্দ্রিয় ক্ষমতায় আমার বা আমার মনোনীত কোনও ব্যক্তির চালানো গাড়ি থামাতে হবে। ৩০★অতীন্দ্রিয় দৃষ্টির সাহায্যে একটি খামেএকটি খামে বা বাক্সে রাখা জিনিসের সঠিক বর্ণনা দিতে হবে।

★চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারীদের নিম্নলিখিত শর্তগুলো মানতে হবে :★ ১★আমার চ্যালেঞ্জের অর্থ গ্রহণ করুন বা না করুন, আমার চ্যালেঞ্জ যিনি গ্রহণ করতে ইচ্ছুক, তাঁকে আমার কাছে, আমার মনোনীত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে জামানত হিসেবে কুড়ি হাজার টাকা জমা দিতে হবে। জামানতের ব্যবস্থা রাখার একমাত্র উদ্দেশ্য আমার সময় ও অকারণ শ্রম বাঁচানো, সেই সঙ্গে যাঁরা শুধুমাত্র সস্তা প্রচারের মোহে অথবা আমাকে অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে ফেলার জন্য এগোতে চান,তাঁদের প্রতিহত করা।

২★যাঁর নামে জামানতের অর্থ জমা হবে, একমাত্র তিনিই চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারী হিসেবে গণ্য হবেন।

৩★চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারী ছাড়া আর কারও সঙ্গে চ্যালেঞ্জ বিষয়ে কোনও রকম আলোচনা চালানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

৪★কেবলমমাত্র চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারী চ্যালেঞ্জ বিষয়ে পরবর্তী আলোচনায় আমার সঙ্গে অথবা আমার মনোনীত ব্যক্তির সঙ্গে বসতে পারবেন বা যোগাযোগ করতে পারবেন।

৫★চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারীকে আমার মনোনীত ব্যক্তিদের সামনে দাবির প্রাথমিক পরীক্ষা দিতে হবে। ৬★চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারী দাবির প্রাথমিক পরিক্ষায় কোনও কারণে হাজির না হলে, অথবা দাবি প্রমাণ করতে না পারলে, তাঁর জামানতের অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হবে।

৭★চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারী প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে আমি সর্বসমক্ষে চূড়ান্ত এবং শেষ পরীক্ষা গ্রহণ করব।

৮★পরীক্ষায় চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারী তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণ রাখলে, আমি পরাজয় স্বীকার করে নেব। আপনারা নিশ্চই লক্ষ করেছেন, আমি সেই অলৌকিক ক্ষমতাগুলোই দেখাতে বলেছি, যে'গুলোকে নিয়ে বিভিন্ন রেইকি-গ্র্যান্ডমাস্টার, ফেংশুই বিশেষজ্ঞ, বাস্তুবিশেষজ্ঞ, জ্যোতিষী, তান্ত্রিক, ওঝা, গুণিন ও উপাসনা ধর্মের গুরুরা দাবি করেন। পত্র পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে হেঁকে-ডেকে দাবি করেন। ★★★আমি চাই, আমার এই চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে আরও কিছু মানুষ বুঝতে শিখুন, বিশ্বাস করতে শিখুন, অলৌকিক ক্ষমতাবান কোনও ব্যক্তির অস্তিত্ব বিশ্বে নেই। অলৌকিকতা যা আছে, তা শুধুই পত্র - পত্রিকা, 'ধর্মগ্রন্থ' ও বইয়ের পাতায়।★★★ 'অলৌকিক নয়, লৌকিক' গ্রন্থের প্রথম খন্ড লেখার সময় রেইকি, ফেংশুই, বাস্তু ইত্যাদি বিশেষজ্ঞ প্রতারকদের রমরমা ছিল না। ওদের প্রতারণা বে-আব্রু করতেই চ্যালেঞ্জের পৃষ্ঠাটি ঢেলে সাজালাম। -

প্র★বী★র★★ঘো★ষ। অলৌকিক নয়,লৌকিক[পঞ্চম খন্ড]। চতুর্থ সংস্করণ। -দে'জ পাবলিশিং।

If you found this article interesting, please copy the code below to your website.
x 
Share

Leave a Reply