যুক্তিবাদী সমিতির কিংকরবাটী শাখা ও গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় বন্ধ হল বেআইনি মন্দির তৈরীর কাজ

লিখেছেন:দেবরাজ দাস

কানানদীর ধারে শান্ত ,নিরিবিলি আমাদের গ্রাম কিংকরবাটী ,এখানকার মানুষ খুব শান্তি প্রিয় ,মূলত মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র সাধারন খেটে খাওয়া মানুষেরই বসবাস।ধর্ম বলতে,গ্রামের সবটাই হিন্দু,গ্রামে সব মিলিয়ে ছোটো বড় মন্দির আছে প্রায় ৫০ টি। সারাবছর হরিনাম,পূজা লেগেই থাকে,বলতে গেলে,সবমিলিয়ে মানুষ বেশ খুশিতেই থাকেন।

গন্ডগোলের বিষয় হনুমান । আমাদের এদিকে মাঝেমাঝেই দল বেঁধে হনুমানের দল আসে,লোকের গাছের ফল থেকে আচারের জার,সবই নিজেদের মত করে তারা ধ্বংস করে নষ্ট করে আবার চলেও যায়,এই উপদ্রব চরম হলে গ্রামের মানুষ চকলেট বোম থেকে ইট,পাথর,সবই তাদের উদ্দেশ্যে দয়াহীন ভাবে নিক্ষেপ করে॥ ঘটনার শুরু গত শনিবার ৭ জুলাই।একদল হনুমানের মধ্যে আচমকা একটি হনুমান মারা যায় বিদ্যুতের তারে শক লেগে । মারা যেতেই সারাদিন পাড়ার লোকের চিন্তা পরে যায় ওই মৃত হনুমান নিয়ে,নানা জনের নানা কথা।কেউ বলে হনুমান রামের পরম ভক্ত তাই পোড়াতে নেই,তো কেউ বলে ''বজরঙ্গবলি" কবর দিতে হয় ।এই পরিস্হিতিতে পাড়ার সবাই ঠিক করে গ্রামের শেষে নদীর ধারে মৃত হনুমানকে কবর দিয়ে তার যথাযথ সন্মান দেওয়া হবে।এখান পযন্ত সব ঠিকই ছিল ।

খেলা শুরু হয় তার পর,,পাড়ার কিছু আচমকা গজিয়ে ওঠা উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলের অল্পবয়সী নেতারা সাধারন মানুষের আবেগের সুযোগ নিয়ে গল্প ফাঁদে ওই সমাধির উপর তৈরী হবে বজরঙ্গবলির মন্দির ।এখানে উল্লেখ্য এটাই,যারা দুবছর আগে পর্যন্ত হিন্দু ধর্মে শিব-কালী ছাড়া অন্য দেবতা আছে বলে জানতই না,তারা হঠাত এত হনুমানের ভক্ত হল কী করে!!যাই হোক,নেতারা মন্দির ও সমাধির জায়গা ঠিক করলেন গ্রামের প্রান্তে নদীর উপর থাকা একটি রেনিগেট এর সংলগ্ন ডিভিসির জমি। ডিভিসি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নদীর বাঁধে এই ভাবে সরকারি জায়গায় কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তৈরী করা যে সম্পূর্ন বে-আইনি,তা বোধহয় ওই নেতারা জানতেন না।

আইন এবং সরকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলতে থাকল মন্দির তৈরীর পরিকল্পনা।ইতিমধ্যে ওই হনুমানকে সমাধিস্হ করা হয়েছে প্রস্তাবিত জায়গায় ।তার উপর নামাবলি চাপিয়ে ধুপ ধুনো দিয়ে পূজাপাঠও সম্পন্ন হয়েছে।সমাধির উপর লাগানো হয়েছে বজরঙ্গদলের পতাকা ও একটি পাথরের গম্বুজের গায়ে লেখা হয়েছে "জয় শ্রী রাম "।এখানে একটা কথা বলা হয়নি,ওই জায়গাটি গ্রামবাসির বিভিন্ন কাজে সারাবছর ব্যবহার হয়।কোনো রাস্তা হলে তার মালপত্র ফেলা হয় ওখানেই ।

মন্দির তৈরীর জন্য চাঁদা তোলা হয় পাড়ায় পাড়ায় ।দুদিনেই হুজুগে কান দিয়ে টাকা ওঠে হাজার হাজার।মন্দির নির্মানের মিস্ত্রিও ঠিক হয়ে যায় । ১০ জুলাই, মঙ্গলবার সকাল থেকে ইট,বালি ও সিমেন্ট এনে হাজির হয় নেতা ও তাদের সাগরেদরা।শুরু হয় গর্ত খোঁড়ার কাজ । ইতিমধ্যেই পাড়ার একাংশ এবং আমরা বিষয়টির উপর আলোচনা করে ,স্হানীয় ক্লাবের সাহায্যে মন্দির তৈরীর উপর নিষেধাঙ্গা জারি করি,কাজ বন্ধ হয়॥ওই দিন সন্ধ্যায় ক্লাব ঘরে মিটিং ডাকা হয় মন্দির তৈরীর বিষয়ে।

যুক্তিবাদী সমিতি ও গ্রামবাসী,উভয় তরফ থেকে আমরাও উপস্হিত ছিলাম ।গোটা মিটিং এ ওই দলের নেতারা নিজেদের মত করে মন্দির তৈরীর পক্ষে হাজারো যুক্তি দিলেও পাড়ার সবার সঙ্গে যুক্তির লড়াই এ শেষ পর্যন্ত পারেনি। সঙ্গে সঙ্গে বিপদ বুঝে নেতাগন এই নোংরা কর্মকান্ডের জন্য ক্ষমা চেয়ে কাজ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেয় ।সাথে এও কথা দেয় যে জায়গাটি আবার আগের রুপে ফিরিয়ে দিয়ে ওখানথেকে ইট,বালি সরিয়ে নেবে॥খুলে ফেলে দেওয়া হয় গেরুয়া পতাকা ॥ এই ঘটনা আবারও প্রমান করল ,উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলগুলোর উস্কানিতে সাধারন মানুষকে ফাঁসানোর চক্রান্ত কখনই সফল হবে না,বাংলা ও বাংলার মানুষ ভালোবাসে সম্প্রীতি । এই ঘটনা একইভাবে এই বার্তা দিল যে,এই দলগুলো যেন নিজেদের এই নোংরা হাতের থাবা বসানো বন্ধ করে,না হলে সাধারন মানুষ ওই হাত ভেঙে দিতে বেশি সময় নেবে না ।

ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি। কিংকরবাটী-হরিপাল শাখা । ১১ জুলাই,২০১৮

এই সেই যায়গা

If you found this article interesting, please copy the code below to your website.
x 
Share

One Response to “যুক্তিবাদী সমিতির কিংকরবাটী শাখা ও গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় বন্ধ হল বেআইনি মন্দির তৈরীর কাজ”

  1. Profile photo of phoenix
    phoenix 11 July 2018 at 11:17 PM #

    valo


Leave a Reply