• SRAI

শ্রী চৈতন্যদেবের অন্তর্ধান রহস্য।। অন্তিম কিস্তি।


শ্রীচৈতন্যের কয়েকশো বছর আগে বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের প্রবক্তা শ্রীরামানুজ বৈষ্ণবধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন পুরীতে। তাঁকেও যে বিষম পরিণতির সন্মুখীন হতে হয়েছিল তাঁর প্রমাণ আছে ‘প্রপন্নামৃত’ সংস্কৃত গ্রন্থে। এতে বলা হয়েছে, ‘শ্রীজগন্নাথদেব শ্রীরামানুজস্বামীকে ‘একরাত্রে পুরুষোত্তম থেকে কূর্মতীর্থে টেনে ফেলে দিয়েছিলেন’ (চৈতন্যচরিতামৃত, গৌড়ীয় মঠ সং, অমৃতপ্রবাহভাষ্য, মধ্য ৭/১১৩)। এই কিংবদন্তীর তাৎপর্য সম্ভবত এই যে, জগন্নাথক্ষেত্রে রামানুজ ধর্ম প্রচার করতে এলে তাঁর সঙ্গে বিরোধ বেধেছিল জগন্নাথসেবকদের সঙ্গে। ‘টেনে ফেলে দেওয়া’ কথাটির মধ্যে সেই বিরোধ ও বর্জনের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওড়িশা বাসিদের উপর রামানুজের তুলনায় চৈতন্যের প্রভাব ছিল নিঃসন্দেহে অনেক বেশি। জনগনের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা মনে রেখে তাই ষড়যন্ত্রকারীদের অনেক অনেক ভেবেচিন্তে মাথা খাটিয়ে কাজ করতে হয়েছে গোপনে। আষাঢ় মাসের শুক্লা সপ্তমী তিথি অন্তর্ধানের সময় হলে বুঝতে হবে, রথযাত্রা উৎসবে যখন দেশের মানুষ অত্যন্ত ব্যস্ত তখন তাদের সেই ব্যস্ততারই সুযোগ নিতে চেয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা।

এখনও যদি আপনি তোটা গোপীনাথ মন্দির চত্বরে সমাধিবেদিতে (এতটাই ছোট যে কেউ না বলে দিলে বোঝা যায়না) যান তাহলে দেখতে পাবেন অত্যন্ত ছোট জায়গায় ওই চপ্তরেই বাংলায় পাথরে খোদিত আছে - "কি কহিব কোথা যাব বাক্য নাহি স্ফুরে, হারাইলাম গোরাচাঁদে গোপীনাথের ঘরে" গসাধরের উক্তি এটি। এটি যদিও চৈতন্যদেবের বহির্বাস এরই সমাধি। তবুও বারংবার মননে এই চিত্রই আছে তবে কী এখানেই...?

'ভারতের সাধক’ তৃতীয় খণ্ডে শঙ্করনাথ রায় শ্রীচৈতন্যের লোকান্তর প্রসঙ্গে লিখেছেন, “১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দে। আষাঢ় মাস। বেলা তখন প্রায় তৃতীয় প্রহর। এক দিব্য ভাবাবেশে আবিষ্ট হইয়া প্রভু জগন্নাথদেবের মন্দিরে প্রবেশ করিলেন। নাটমন্দিরে গরুড় স্তম্ভের নীচে প্রতিদিন গিয়া দাঁড়ান, যুক্ত করে ভাবতন্ময় অবস্থায় পুরষোত্তম বিগ্রহের চিন্ময় রূপসুধা পান করেন, নয়নজলের ধারায় সারা দেহ ভিজিয়া যায়। কিন্তু আজ কেন তিনি সরাসরি মূল বেদীকোঠায় ঢুকিয়া পড়িলেন? কেন এই অদ্ভুত ব্যতিক্রম? ভক্তগণ সবিস্ময়ে তাঁহার কাণ্ড লক্ষ্য করিতেছেন। হটাৎ এক সময়ে অন্তগৃহের দ্বার বন্ধ হইয়া গেল। সবাই বাহিরে, ভিতরে রহিলেন শুধু প্রভু আর তাঁহার শ্রীজগন্নাথ। সন্মুখে বিরাজিত পরম জাগ্রত দারুব্রহ্ম, শ্রীচৈতন্যের ধ্যানের ধন, ‘ঈশ্বর পরমঃ কৃষ্ণ’-এর দিব্য শ্রীবিগ্রহ। ভাবোদ্বেল প্রভু হুঙ্কার দিয়া সেদিকে ধাবিত হইলেন। বাইশ বৎসর পূর্বে, প্রথম দর্শনের দিনটিতে এমনি আত্মহারা এমনি পাগলপারা হইয়া এই পুরুষোত্তম বিগ্রহকে কোলে নিতে তিনি ছুটিয়াছিলেন। সেদিন ঘটিয়াছিল নীলাচল-লীলার উদ্বোধন। আজ আবার এ কোন পর্ব? একই নিত্যলীলায় প্রবেশের সূচনা? এইদিনও শ্রীবিগ্রহকে চৈতন্য তাঁহার বুকে তুলিয়া নিতে গেলেন। মূহূর্তমধ্যে এক মহা অলৌকিক কাণ্ড ঘটিয়া গেল। চিরতরে তিনি হইলেন অন্তর্হিত। বহু খোঁজাখুঁজিতেও প্রভুর মরদেহের সন্ধান আর পাওয়া যায় নাই। অগণিত ভক্তের ব্যাকুল অনুসন্ধান, উড়িষ্যারাজ প্রতাপরুদ্রের আপ্রাণ প্রয়াস, সব কিছু সেদিন ব্যর্থ হয়। এ রহস্যময় অন্তর্ধান চিরদুর্বোধ্য রহিয়া যায়।’’

পরিষেশে অসংকোচে বলা যায়, শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্যের যবনিকা সম্পূর্ণ উন্মোচিত করার মতো নিশ্চিন্ত কোনও তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি আজও। এ আলোচনায় উদ্দেশ্য হল অন্তর্ধানের পিছনে অপরাধমুলক ক্রিয়াকাণ্ডের সম্ভাব্যতা বিচার করা। তৎকালীন সাহিত্য, সমাজ ও রাজনীতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেল তা আদৌ অসম্ভব ছিল না।

শ্রীচৈতন্যদেবের আন্দোলনটা ছিল মূলত ব্রাহ্মণ্যবাদের কাছে নিপীড়িত মানুষের ধর্মীয় অধিকার আদায়ের সংগ্রাম৷ অবহেলিত মুসলিম, বৌদ্ধদেরও ধর্মের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম৷ যদিও সেকথা অধিকাংশ মানুষের কাছেই বিস্মৃত অনেক ধর্মগুরু বা প্রচারকের কল্যাণে। যাই হোক এই অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের কাজে শ্রীচৈতন্যদেব অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিলেন৷ তাঁর মৃত্যু তাঁর কাজে ব্যাঘাত ঘটালেও আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের কাছে এখনও প্রাসঙ্গিক এবং এই প্রতিবাদ স্বরূপ মৃত্যু নতুন করে ধর্ম নামক করাল গ্রাসকে মনে করিয়ে দেয় সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। শেষ হোক ধর্ম নিয়ে অধর্মের লড়াই। প্রতিষ্ঠা হোক মানবতার, ধ্বংস হোক সব অযুক্তির এবং সবার মননে জায়গা করে নিক যুক্তিবাদ এই আশা রেখে আমার কলম আপাতত স্থগিত রাখলাম।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার আমি গবেষক নই সুতরাং এ লেখার কোনও কথা আমার কথা নয়। এই ৭ পর্বের লেখনীতে অনেক লেখকের এবং তাদের সমালোচনা এবং তাদের গ্রন্থের কথা বলেছি। উক্ত সকল গ্রন্থ থেকে বিষয় অবিকৃত রেখে কখনও ভাষা ও বানান পরিবর্তন, কখনও সম্পাদনা করে তাদের কথা আমার ভাষায়, আবার কখনও তাঁদের কথা হু-বহু তাঁদেরই ভাষায় তুলে দিলাম পাঠকের করকমলে। তাই কৃতজ্ঞতা জানাই সব চৈতন্য বিষয়ক লেখক/লেখিকাদের।

গবেষক যুধিষ্ঠির জানা লিখিত "শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য" পুস্তকটি আমার কৌতুহলকে উদ্দীপ্ত করেছিল। এছাড়াও আপনাদের কাছে তুলে দিচ্ছি কিছু পুস্তকের তালিকা-- ১.ডঃ দীনেশচন্দ্র সেন-- চৈতন্য এণ্ড হিজ এজ। ২.রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়-- হিস্ট্রি অফ ওড়িশা। ৩.বিমান বিহারী মজুমদার-- চৈতন্য চরিতের উপাদান। ৪.ডঃ জয়দেব মুখোপাধ্যায়-- কাহাঁ গেলে তোমা পাই। ৫.শিশির কুমার ঘোষ-- অমিয় নিমাই চরিত। ৬.গিরিজা শংকর রায় চৌধুরী-- শ্রীচৈতন্য ও পার্ষদগণ। ৭.ডঃ রাধাগোবিন্দ নাথ-- মহাপ্রভু শ্রীগৌরাঙ্গ। ৮.প্রমথনাথ তর্কভূষণ-- বাংলার বৈষ্ণব ধর্ম। ৯.ভূপতি রঞ্জন দাস-- তীর্থপথিক মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য। ১০.সুন্দরানন্দ বিদ্যাবিনোদ-- শ্রীচৈতন্য, শ্রীক্ষেত্র। ১১.প্রভাত মুখোপাধ্যায়-- হিস্ট্রি অফ মিডিয়াভ্যাল বৈষ্ণব ইন ওড়িশা। ১২.ডঃ হরেকৃষ্ণ মহতাব-- হিস্ট্রি অফ ওড়িশা। ১৩.চক্রধর মহাপাত্র-- ওড়িশা ইতিহাসের এক অজ্ঞাত অধ্যায়। ১৪.ডঃ সদাশিব রথশর্মা গবেষণাপত্র। (প্রাচীন বাংলা সাহিত্য) ১৫.মুরারি গুপ্তের কড়চা। ১৬.কবি কর্ণপুর পরমানন্দ সেন-- চৈতন্য চন্দ্রামৃত। ১৭.স্বরূপ দামোদরের কড়চা। ১৮.বৃন্দাবন দাস-- চৈতন্য ভাগবত। ১৯.লোচন দাস-- চৈতন্য মঙ্গল। ২০.জয়ানন্দ-- চৈতন্য মঙ্গল। ২১.কৃষ্ণদাস কবিরাজ-- চৈতন্য চরিতামৃত। ২২.চুড়ামনি দাস-- গৌরাঙ্গ বিজয়। ২৩.মহামুনি ভাণ্ডারী-- প্রভাসখণ্ড। (প্রাচীন উৎকল সাহিত্য) ২৪.মাধব দাস-- চৈতন্য বিলাস। ২৫.ঈশ্বর দাস-- চৈতন্য ভাগবত। ২৬.বৈষ্ণবচরণ-- চৈতন্য ভাগবত। ২৭.অচ্যুতানন্দ ও দিবাকর দাসের পুঁথি (বিমানবিহারী মজুমদার সম্পাদিত) ২৮.গোবিন্দ দাস বাবাজী--চৈতন্য চকড়া পুঁথি ( ডঃ সদাশিব রথশর্মা সম্পাদিত) ২৯.জগন্নাথধাম মাদলা পঞ্জী। ৩০.ডঃ অসিত বন্দোপাধ্যায়-- বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (দ্বিতীয় খণ্ড, চৈতন্য যুগ) ৩১.প্রাচ্যবিদ্যার্ণব নগেন্দ্রনাথ বসু--বিশ্বকোষ। ৩২.অক্ষয় কুমার দত্ত-- ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়।

ধন্যবাদ।

©Avishek Dey

106 views1 comment

SRAI

The Science and Rationalists' Association of India (Bengali: ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি, Bharatiya Bigyan O Yuktibadi Samiti) is a rationalist group based in Kolkata, India.

Reg.-S/63498 of 1989-90

Get Monthly Updates

© 2020 All rights reserve by www.srai.org