• SRAI

''ধর্মনিরপেক্ষতা ও শিক্ষক সমাজ:"

Updated: Jul 13

'ধর্মনিরপেক্ষতা' বা Secularism শব্দটার উৎপত্তি ইউরোপে। উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের এক মহত্তম ধারণা এই Secularism যার আভিধানিক অর্থ An ism does not related with religion and non entity to any supernatural existence। অর্থাৎ ধর্মের সঙ্গে কোনরূপ সম্পর্কিত নয় এমন একটি মতবাদ হল ধর্মনিরপেক্ষতা।

লিখেছেন-পরেশ দেবনাথ


[ বহুদিন আগে আমার এই লেখাটি ছাপার অক্ষরে আত্মপ্রকাশ করেছিল মুর্শিদাবাদের 'বিজ্ঞান ভাবনা' পত্রিকায়। তার আগে এক শিক্ষক বন্ধুর অনুরোধে লেখাটি জমা দিই শিক্ষকদের দ্বারা পরিচালিত একটি পত্রিকায়।কিন্তু সেই শিক্ষক-সম্পাদক লেখাটি পড়ে এতই ক্রুদ্ধ হন যে তারপর থেকে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলাই বন্ধ করে দেন।লেখাটা ছাপেন নি সেটা বলাই বাহুল্য। আমার ফেসবুকের কিছু বন্ধু লেখাটা পোস্ট করতে বলেছিলেন।কিন্তু এত বড় লেখাটা কম্পোজ করা আমার পক্ষে দু:সাধ্য।শেষ পর্যন্ত আমার এক ফেসবুকের বন্ধুই তার সাহায্যের হাতটা বাড়িয়ে আমাকে লেখাটা পোস্ট করতে উৎসাহিত করেন।লেখাটা অবিকল এখানে দিলাম সচেতন বন্ধুদের মতামতের আশায়।] ভারতবর্ষের সংবিধান ১৯৫০ সালের ২৬ শে জানুয়ারি থেকে চালু হল। এটি ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রররূপে গড়ে তুলতে অঙ্গীকার করল যেখানে তার সকল নাগরিক সমানভাবে,ন্যায্যভাবে স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্বের সুযোগ পাবে। যদিও 'ধর্মনিরপেক্ষ ' এই শব্দটি যুক্ত হয়েছিল অনেক পরে।১৯৭৬-এর ১১ নভেম্বর ভারতের পার্লামেন্ট অনুমোদিত এবং ১৮ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত রাষ্ট্রপতির ৪২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ভারতের সংবিধানে এই প্রথম বলা হল ভারত একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। এছাড়া এই প্রথম ভারতীয় নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্যের কথা বলা হল। প্রতি ভারতীয় নাগরিকের কর্তব্য হচ্ছে বিজ্ঞান মনস্কতা, মনুষ্যত্ব এবং অনুসন্ধিৎসা ও সংস্কার সাধনের মানসিকতার বিকাশ ঘটানো। "It shall duty of every citizen of India to develop the scientific temper humanism and the spirit of inquiry and reform.{Article 51A(h)Part iv A}"।

সংবিধানের ২৮ নং ধারায় ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের প্রতিফলন আছে। এতে বলা হল- ১.) সম্পূর্ণভাবে সরকারী অর্থে পরিচালিত কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোন ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া চলবে না।

২.) ১ নং উপধারায় বর্ণিত কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোন ট্রাস্ট বা প্রতিষ্ঠান দ্বারা স্থাপিত হয়েও যদি সরকার দ্বারা পরিচালিত বা প্রশাসিত হয় তবে নিজস্ব মতে ধর্মশিক্ষা দিতে পারবে না।

৩.) নিজের ইচ্ছা না থাকলে কোন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে বা অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে অভিভাবকদের বিনা অনুমতিতে কোন শিক্ষাপ্রার্থীকে সরকারী অর্থ সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষা বা নির্দেশনামা গ্রহনে বাধ্য করা যাবে না।

সংবিধানের ১৯ নং ধারার ২ নং উপধারায় বলা হচ্ছে ধর্ম, জাতি(race), বর্ণ(cast), ভাষার কারণে কোন নাগরিককে সরকারী বা সরকারী অর্থ সাহায্যে পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে বাধা দেওয়া চলবে না।

দুঃখের বিষয় খাতা কলমে ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, অনুসন্ধিৎসা ইত্যাদির কথা বলা হলেও এখনো আমাদের দেশের আইনকানুন, শিক্ষাব্যবস্থা, সরকারী ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রেই সেই আইনকে উপেক্ষা করছে।

শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯ অনুসারে শিশুর অধিকারের মধ্যে বলা হচ্ছে - বিদ্যালয়ে শিশুর ভর্তির সময় কোন ক্যাপিটেশন ফি বা ডোনেশন নেওয়া যাবেনা। অথচ নানা কৌশলে সেটা নেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের গর্ব করে বলতে শুনেছি - "আমরা ভর্তি ফি নিচ্ছি না। তবে সরস্বতী পুজোর চাঁদা নিচ্ছি মাত্র।" এই টাকার পরিমাণ ২০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত! এখানেই আমাদের প্রশ্ন তাহলে কি আমরা সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা করলাম? শিক্ষা বলতে বুঝি শিশুর সর্বাঙ্গীণ বিকাশ। শুধুমাত্র পুথিগত শিক্ষা অর্জন করে স্বচ্ছল জীবনযাপন করাকে সর্বাঙ্গীণ বিকাশ বলা যায় কি? আইনস্টাইন-এর কথায় - "শিক্ষার বিষয় এমন হবে যে, প্রতিটি ছাত্র তার সহজাত গুণাবলী উন্নত করা ছাড়াও শুধু নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার চিন্তা না করে সমাজের আর পাঁচজনের দায়িত্ব গ্রহণ করার বোধকে বিকশিত করতে পারে।"

'ধর্মনিরপেক্ষতা' বা Secularism শব্দটার উৎপত্তি ইউরোপে। উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের এক মহত্তম ধারণা এই Secularism যার আভিধানিক অর্থ An ism does not related with religion and non entity to any supernatural existence। অর্থাৎ ধর্মের সঙ্গে কোনরূপ সম্পর্কিত নয় এমন একটি মতবাদ হল ধর্মনিরপেক্ষতা। অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের আইন,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক কার্যাবলীতে ধর্মীয় সংস্রব থাকবে না। কিন্তু এই অর্থকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমাদের মগজে ঢোকানো হচ্ছে 'ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে সকল ধর্মের সমান অধিকার '। ধরে নিন ব্রাজিল আর্জেন্টিনার ফুটবল ম্যাচ হচ্ছে।যদি রেফারি ব্রাজিলকে অফসাইডে একটি গোল দেয় তবে কি আর্জেন্টিনাকে অফসাইড গোলের সুযোগ দিয়ে নিজের নিরপেক্ষতা বজায় রাখবেন? যেটা অফসাইড সেটা তো অফসাইডই। তাছাড়া শিশুমনে আমরা তার অজান্তেই কিছু যুক্তিহীন বিশ্বাস তার মনে গেঁথে দিচ্ছি যে পড়াশোনা না করেও বাৎসরিক সরস্বতী বন্দনা করলেই আমার বিদ্যার্জন হয়ে যাবে। এরাই পরবর্তীকালে দেশের নাগরিক হয়ে কেউ যদি যুক্তিহীন ধর্মীয় আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে যদি এক একজন উগ্রসাম্প্রদায়িক কুসংস্কারের দাস হয় তাহলে আমরা কী দায়ী থাকবনা? অনেকে বলেন ধর্ম নাকি মানুষকে ধারন করে। সংস্কৃত ধৃ ধাতু থেকে বুৎপত্তিগত অর্থেই তারা এই সংজ্ঞা ব্যবহার করেন। কিন্তু ধর্মের এই সংজ্ঞার অর্থ এত ব্যাপক যে তা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। ধর্ম যেভাবে মানুষকে ধারণ করে তা মানুষের ধী শক্তি ও নান্দনিক চেতনার পক্ষে আদৌ উপযোগী কিনা তা গভীর চিন্তার বিষয়। আমাদের মতে জলের ধর্ম গড়িয়ে যাওয়া, আগুনের ধর্ম দাহিকাশক্তি, তলোয়ারের ধর্ম যেমন তীক্ষ্ণতাতে মানুষের ধর্ম মনুষ্যত্বে। একমাত্র ধর্মীয় মৌলবাদীরাই অন্ধ বিশ্বাসে ভর করে জোর দিয়ে বলতে পারেন ধর্ম ছাড়া মানুষের গতি নেই। অথচ আমাদের দেশের মনীষীরা বারবার সতর্ক করেছেন - "ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/ অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে/নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর/ নাস্তিকতার করেনা আড়ম্বর/ শ্রদ্ধা করিয়ে জ্বালে বুদ্ধির আলো/ শাস্ত্র মানে না, মানে মানুষের ভালো। ( ধর্মমোহ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। আর একটি চিঠিতে হেমন্তবালা দেবীকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন - "আচার বিচারের মুঢ়তা সমস্ত দেশের বুকে যে কি জোরে চেপে ধরেছে তা, একখানা পাঁজি পড়লেই বোঝা যায়। অথচ পাঁজি তার নির্বুদ্ধির স্তূপাকার বোঝা নিয়ে ঘরে ঘরে ফিরে বেড়াচ্ছে --- আমার তো লজ্জা বোধ হয়।" পৃথিবী ও চাঁদ তাদের কক্ষপথে সূর্যের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে যখন একই সরলরেখায় আসে তখন পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর এবং চাঁদের ছায়া পৃথিবীর উপর পড়লে যথাক্রমে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ হয়। এর মধ্যে রাহু কেতুর যে গল্প তা কাল্পনিক ও মিথ্যা। এই সত্য জানা সত্ত্বেও ছাত্রদের অন্ধ আচরণে ব্যথা পেয়ে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র লিখেছেন - "আজ অর্ধশতাব্দীকাল ছাত্রদিগকে এই বৈজ্ঞানিক সত্যের ব্যাখ্যা করিয়া বুঝাইয়া আসিলাম। তাহারাও বেশ বুঝিল এবং মানিয়া লইল, কিন্তু গ্রহণের দিন যেই ঘরে শঙ্খ বাজিয়া ওঠে এবং খোলকরতাল সহযোগে দলে দলে কীর্তনীয়ারা রাস্তায় মিছিল বাহির করে, অমনি এই সকল সত্যের পূজারীরাও সকল শিক্ষাদীক্ষা জলাঞ্জলি দিয়া দলে ভিড়িতে আরম্ভ করে এবং ঘরে ঘরে অশৌচান্তের মত হাঁড়িকুঁড়ি ফেলার ধূম লাগিয়া যায়। যে দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায় সত্য কি তাহা জানে এবং বোঝে, কিন্তু জীবনে বরণ করিয়া লইতে প্রস্তুত নহে সে জাতি কেমন করিয়া জগতের নিকট সগর্বে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইবে তাহা আমার বুদ্ধির অতীত।" (সত্যের সন্ধান)। বিদ্যাসাগর কবে বলে গেছেন -- "বেদ বেদান্ত মিথ্যা, এগুলোর মধ্যে সত্য বলে কিছু নেই।" কুসংস্কারমুক্ত শিক্ষক ও পিতামাতাকে তিনি কতখানি মর্যাদা দিয়েছেন। বলেছেন --- "শিক্ষকের এইসব গুণ থাকবে, তারা নিজেদের ভাষায় সুশিক্ষিত হবেন, বিভিন্ন বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করবেন এবং দেশের প্রচলিত কুসংস্কার থেকে যতদূর সম্ভব মুক্ত থাকবেন।" কী পরম সতর্কতায় শিশুদের জন্য বর্ণপরিচয় লিখেছেন যেখানে একটি শব্দও 'ঈশ্বরে'র জন্য খরচ করেননি। শরৎচন্দ্র তাঁর পথের দাবী উপন্যাসে বলেছেন -- "সমস্ত ধর্মই মিথ্যা। আদিমযুগের কুসংস্কার। বিশ্বমানবতার এত বড় চরম শত্রু আর নাই।"

এখন প্রশ্ন যুগে যুগে মহান মনীষীদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কেন আমরা একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এত কুসংস্কারাচ্ছন্ন? ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের এত রমরমা? শিক্ষার হার তো আগের থেকে বেড়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন শিক্ষা এলেই যাবতীয় অন্ধতা দূর হবে কথাটা শুনতে যতই শ্রুতিমধুর হোক না কেন এটা পরীক্ষিত অসত্য। আসলে যাবতীয় অন্ধতা, কুসংস্কার, কূপমণ্ডূকতা দূর হওয়ার নামই শিক্ষা। ডিগ্রির লেজুড় যত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হোক না কেন, উপরোক্ত বন্ধনগুলো থেকে মুক্ত না হলে তিনি শিক্ষিতই নন।

একটা শিশু জন্মগ্রহণ করে কোন ধর্মপরিচয়ের শারীরিক চিহ্ন বা ধারণা না নিয়েই। আর তার বাবা-মা, বাড়ির লোক জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে ঠিকুজি কুষ্ঠী তৈরির জন্য জ্যোতিষীর আশ্রয় নিচ্ছেন। জন্ম থেকেই তাকে দেব নির্ভর করে তুলছেন। বিভিন্ন দেবদেবীর, গুরুজীর আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য মাদুলি, তাবিজ, কবচ শিশুটিকে পরিয়ে দিচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে ঐ শিশুটিকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিকৃতমানসিকতায় পুষ্ট করার জন্য বাবা-মা অজান্তেই একাজ করে ফেলছেন। বাবা-মার পরে শিশুর বিকাশে বড় ভূমিকা নেন শিক্ষক। এমন ক্ষেত্রে শিক্ষকের কাজটা কঠিনও। কারণ জগৎবিখ্যাত শিশুমনোবিদ ও শিক্ষাবিদ ম্যাকারেঙ্কো বলেছেন --- "শিশুকে সঠিক ও স্বাভাবিকভাবে মানুষ করে তোলা অনেক অনেকগুন সহজ, কেচেঁ গন্ডুষ করিয়ে তাকে পুনঃশিক্ষিত করে তোলার চেয়ে...।"

বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক ছাত্রের কাছে -- "Friend, philosopher and guide" ছাত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে সঠিকভাবে পাঠদান করা এবং তাকে আগামী দিনের একজন প্রকৃত মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা একজন শিক্ষকের প্রকৃত কাজ। ছাত্রকে সমস্ত রকম কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার জন্য শিক্ষক আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে আমরা এমন অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকাকে জানি, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী হলেও অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয় দিতে পারছেন না। ছোটবেলা থেকেই যে পরিবেশে তিনি লালিত পালিত হয়েছেন, সেই ফেলে আসা দিনের চিন্তাভাবনা যে একেবারে জন্মের পর থেকে বাবা মা মনের মধ্যে তিল তিল করে ঢুকিয়ে দিয়েছেন তাকে আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়েও মহান ব্রত শিক্ষকতাকে বরণ করেও মনকে আধুনিকতায় পুষ্ট করে তুলতে পারেননি। অনেকসময় তিনি মনে করেন তিনি শিক্ষকতা করার জন্য নয়, চাকরী করার জন্য অন্য কোন পেশা না দেখে এই চাকরিটাই গ্রহণ করেছেন। শিক্ষকতার মহান ধারনাটাই অনেকক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে না তথাকথিত শিক্ষকদের মধ্যে। একজন শিক্ষক হয়ে কেন যে এমন সমালোচনায় অগ্রসর হলাম তা হয়ত অনেকে বুঝতে পারছেন না। কিন্তু বাস্তব যদি তুলে ধরা না যায়,শিক্ষকের মন থেকে অপবিজ্ঞানের দিকগুলো বিদূরিত না করা যায় তবে একজন বিজ্ঞানমনস্ক, কুসংস্কারমুক্ত ছাত্র তথা মানুষ তৈরি হবে কিভাবে? শিক্ষক মহাশয় বিজ্ঞানের আসল সূত্র বৈজ্ঞানিক সত্যকে কাজে লাগিয়ে সমাজবিজ্ঞানের যে বস্তুগত দিকটি তা কখনই তুলে ধরার চেষ্টা করেন না। তাই এমন বিকৃত চিন্তাভাবনা তাঁর মধ্যে থেকে যাচ্ছে। প্রকারান্তরে তিনি যে ছাত্রকে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষাপ্রদান করছেন, তা সিলেবাসের কয়েকটি তত্ত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। যাদের সঙ্গে বাস্তবের মিল ঘটিয়ে একজন সুন্দর মানুষ তিনি তৈরি করতে পারছেন না। আসলে ঐ শিক্ষকের মধ্যে এই ধারনা তৈরী হয়নি যে -- কোন দেবতা বা পরমাত্মার অস্তিত্ব নেই, গ্রহ-নক্ষত্রাদি চলে প্রকৃতিরই নিজস্ব নিয়মে এবং একজন মানুষের জীবন অলৌকিক ও অস্তিত্বহীন কোনকিছুর ইচ্ছা-অনিচ্ছায় নয়, প্রকৃতি ও সমাজের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয় -- তাই জ্যোতিষবিদ্যা-হস্তরেখাবিদ্যা ইত্যাদির মূল ভিত্তিই ভ্রান্ত ধারনার উপর প্রতিষ্ঠিত। গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান, ঠিকুজি, কুষ্ঠি, হাতের রেখা ইত্যাদি বিচার করে মানুষের ভাগ্য, ভূত ভবিষ্যত ইত্যাদি বলে দেওয়ার ব্যাপারটা যে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও অবৈজ্ঞানিক তা এই শিক্ষকের মাথায় থাকছে না। এখানে বিবেকানন্দের একটি কথা উল্লেখ করি -- "মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যবিধাতা, জ্যোতিষের খুঁটিনাটির প্রতি মনোযোগ হচ্ছে, হিন্দুদের অত্যন্ত ক্ষতিকারক কুসংস্কারগুলির মধ্যে একটি। তুমি দেখবে জ্যোতিষ বা এই ধরনের সব রহস্যময় ব্যাপারে আস্থা সাধারণত দুর্বল চিত্তের লক্ষণ। অতএব যখনই এইসব বিষয় আমাদের মধ্যে প্রাধান্য লাভ করবে তখনই আমাদের উচিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, ভালোখাদ্য, আহার ও বিশ্রাম গ্রহণ করা।"

এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে যখন দেখছি ধর্মের অচলায়তন ভেঙে পড়ছে -- প্রায় চারশত বছর পরে ধর্মের মিথ্যা গোয়ার্তুমি ছেড়ে ভ্যাটিকানের পোপ ক্ষমা চাইল গ্যালিলিওর কাছে। তার কয়েকমাস আগে চার্চ অব্ ইংল্যান্ড ক্ষমা চেয়েছে ডারউইন-এর কাছে, আর তখন আমরা শিক্ষকরা নিজেদের কুসংস্কারমুক্ত করার চেষ্টা না করে ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক নীতি নৈতিকতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় বাতাবরণ সৃষ্টি করে চলেছি।

এবারে প্রশ্নটা একান্ত নিজের কাছে -- এতসব জানা সত্ত্বেও আমি কি শিক্ষকতার মর্যাদা রক্ষা করতে পারছি? তবু আশা জাগে এত অন্ধকারের মধ্যেও আলোর ফুলকির দেখো মেলে। সুটিয়ার শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস, সোনারপুরের সুব্রত চ্যাটার্জ্জী, গোসাবার মদনমোহন মন্ডল, ব্যারাকপুরের কল্যাণী মন্ডল-এর মত শিক্ষক-শিক্ষিকারা বিদ্যাসাগর কথিত শিক্ষকতার ঐতিহ্যটা কিছুটা হলেও ধরে রেখেছেন। 'তারে জমিন পর' ছবির মানবিক শিক্ষক রামশঙ্কর নিকুম্ভের মতো মানুষ আজও আছেন যারা শিক্ষার্থীর সমস্যাকে নিজের সমস্যা ভাবতে চান। বন্ধুর মত মিশে শেখার উৎসাহ যোগাতে চান। ছাত্রের ভিতরের মানুষকে জাগাতে, তার ভিতরের সুকুমারবৃত্তির বিকাশ ঘটাতে, আত্মবিশ্বাসে স্থিত করতে, প্রথাগত শিক্ষার সিলেবাসের বাইরে বেরিয়ে আসেন। শিক্ষাকে বহন না করে তাকে আক্ষরিক অর্থেই বাহন করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। জানি -- 'এই পথে আলো জ্বেলে এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে।/সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ...'। (ঋণ স্বীকার: জ্যোতি সরকার)

34 views1 comment

SRAI

The Science and Rationalists' Association of India (Bengali: ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি, Bharatiya Bigyan O Yuktibadi Samiti) is a rationalist group based in Kolkata, India.

Reg.-S/63498 of 1989-90

Get Monthly Updates

© 2020 All rights reserve by www.srai.org